শরীর ও মন নিয়ে লেখালেখি

Thursday, 2 March 2017

নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার



নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি  লিভার

নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভারকে অনেক সময় সংক্ষেপে ফ্যাটি লিভার বা NAFLD বলা হয়। এটাকে  নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার  বলা হয়; কারণ অতিরিক্ত মদ পান করলেও লিভারে একই রকম চর্বি জমে যা অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার নামে পরিচিত। মদ পানের জন্যই হোক কিংবা অন্য কোন কারণে হোক, উভয় ক্ষেত্রে লিভারের পরিবর্তন একই রকম হলেও এদের আলাদাভাবে বিবেচনা করা হয়। কারণ এদের চিকিৎসার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে।
মহিলাদের গর্ভধারণকালে লিভারে চর্বি জমতে পারে। সাধারণত গর্ভধারণের শেষের পর্যায়ে এসে লিভারের চর্বি জমে যাওয়ার সমস্যা প্রকাশিত হয়। গর্ভকালীন ফ্যাটি লিভারের মূলে রয়েছে জিনগত ত্রুটি। তবে এধরণের ফ্যাটি লিভার আলাদা রোগ হিসেবে বিবেচিত হয়।

নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভারের পর্যায়সমূহঃ
নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এটা পর্যায়ক্রমে ঘটে থাকে।
প্রথম পর্যায়ে সাধারণতঃ লিভারের কোষে কোষে চর্বি জমে। এটাকে বলা হয় স্টিয়াটোসিস (steatosis)।
একটি পর্যায় পর্যন্ত লিভারে চর্বি জমলেও তা কোন ক্ষতি করে না; কোন লক্ষণ-উপসর্গও প্রকাশিত হয় না। সাধারণত লিভারের ওজনের ৫%-এর বেশী চর্বি জমলে তা ফ্যাটি লিভার হিসেবে গণ্য করা হয়। এরচেয়ে বেশী চর্বি জমতে থাকলে জটিলতা শুরু হয়। দু’ধরণের জটিলতা এখানে উল্লেখযোগ্যঃ
·       নন-অ্যালকোহলিক স্টিয়াটোহেপাটাইটিসঃ এ পর্যায়ে লিভারে জমা চর্বির প্রতি শরীরের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করে এবং লিভার কোষে প্রদাহ সৃষ্টি হয়।
·       সিরোসিসঃ এ পর্যায়ে প্রদাহের কারণে লিভারের কোষসমূহ বিনষ্ট হয়ে যায় এবং লিভারের গঠনকাঠামো ভেঙে পড়ে। স্বভাবতই নষ্ট অংশসমূহ শুকিয়ে যায় এবং সেখানে ফাইব্রোসিস হয়ে গুটি তৈরি হয়।  

নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভারের কারণ এবং ঝুঁকিসমূহঃ  
আসলে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার কেন হয় তা জানা নেই। তবে শরীরের ওজন বেড়ে যাওয়া বা মেদভুঁড়ি এর একটি বড় কারণ।  অন্যান্য ঝুঁকিসমূহের মধ্যে রয়েছেঃ
  • ·       ডায়াবেটিস
  • ·       রক্তের অতিরিক্ত কোলেস্টেরল
  • ·       উচ্চ রক্তচাপ  

ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ এবং রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল-এই তিনটি সমস্যা একসঙ্গে থাকলে তাকে বলা হয় “মেটাবলিক সিনড্রোম” (metabolic syndrome)। সুতরাং অন্যভাবে বলা যায় মেটাবলিক সিনড্রোম লিভারে চর্বি জমার একটি পর্যায় কিংবা পরিণতি। আর এরফলে এধরণের রোগীদের  ডায়াবেটিসের জটিলতা এবং হৃদরোগ হতে পারে।
বয়স বাড়লেও লিভারে চর্বি জমার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। কারণ বয়সের কারণে ওপরের ঝুঁকিগুলিও বাড়তে থাকে। যারা বিড়ি-সিগারেট বেশী পান করে তাদের লিভারে চর্বি জমার প্রবণতাও বেশী। 
এটা ঠিক যে যাদের লিভারে চর্বি জমেছে তাদের মধ্যে মেদভুঁড়ি থাকার প্রবণতা বেশী। কিন্তু শতকরা ১০ থেকে ২০ জন ফ্যাটি লিভারের রোগী আসলে মোটা নয়। অর্থাৎ কিছু কিছু ক্ষীণকায় মানুষের লিভারেও চর্বি জমতে দেখা যায়।  
মেদভুঁড়ি এবং বাড়তি ওজনের সঙ্গে ফ্যাটি লিভারের সম্পর্ক কি?
মেদভুঁড়ি কিংবা ওজন বেশী থাকলেই কিন্তু সকলের লিভারে চর্বি জমে না; আবার সব ফ্যাটি লিভারের রোগীর ওজন বেশী নয় কিংবা মেদভুঁড়ি নেই। এজন্য মেদভুঁড়ি এবং বাড়তি ওজনের সঙ্গে ফ্যাটি লিভারের প্রকৃত সম্পর্ক পরিস্কার নয়। তবে একটি বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। তাহলো ওজন বাড়লে কিংবা মেদভুঁড়ি থাকলে লিভারে চর্বি জমার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। মনে করা হয় এর পিছনে জিন বা বংশগতির প্রভাব রয়েছে। কিন্তু শরীরে অতিরিক্ত চর্বি জমা মানেই তার কিছু অংশ লিভারে জমে যাওয়ার বিশেষ সম্ভাবনা।
ইদানীং শিশুদের ক্রনিক লিভারের রোগের একটি বড় কারণ ফ্যাটি লিভার। অন্তত শিশুদের ১০ থেকে ২০ শতাংশ এ সমস্যায় আক্রান্ত এবং স্থূলকায় শিশুদের ৫০ থেকে ৮০ শতাংশের ফ্যাটি লিভার আছে।
আজকাল ফ্যাটি লিভার শনাক্ত করার সংখ্যা বেড়েছে; জনগণের মধ্যে মোটা হওয়ার প্রবণতাও বেড়েছে। এজন্য ফ্যাটি লিভার সম্পর্কে গবেষণা এবং সচেতনতাও বাড়ছে।
নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভারের লক্ষণ-উপসর্গঃ
অধিকাংশ ক্ষেত্রে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভারের কোন লক্ষণ-উপসর্গ প্রকাশিত হয় না। অনেকেই নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার থাকা সত্ত্বেও এর উপস্থিতি বুঝতে পারেন না।
সাধারণত অন্য কোন রোগ কিংবা ঝুঁকি সম্পর্কে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে গিয়ে সহসা এটা শনাক্ত হয়। অনেক সময় পেটের কোন সমস্যার জন্য আলট্রাসোনোগ্রাম করাতে গিয়ে ফ্যাটি লিভারের উপস্থিতি ধরা পড়ে।  
তবে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভারের কারণে যে সকল লক্ষণ-উপসর্গ হতে পারে, তা হলঃ
  • ·       অবসাদ
  • ·       ক্লান্তি- সাধারণভাবে পেশী দুর্বল মনে হতে পারে এবং কোন কাজকর্মে উৎসাহ বোধ না করা
  • ·       পেটের উপরের দিকে চাপ অনুভব করা।


আসলে এসকল লক্ষণ-উপসর্গ কোনটিই সুনির্দিষ্ট কিছু নির্দেশ করে না। আরও অনেক কারণেই অবসাদ কিংবা দুর্বলতা অনুভূত হতে পারে। এজন্য নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার শনাক্ত করার জন্য সতর্ক থাকার প্রয়োজন রয়েছে। 
অন্যান্য উপসর্গের মধ্যে রয়েছেঃ
  • ·       ওজন কমে যাওয়া
  • ·       ক্ষুধামন্দা
  • ·       বমি বমি ভাব
  • ·       পেটে ব্যথা

নন-অ্যালকোহলিক  ফ্যাটি লিভার হলে লিভারের আকার বেড়ে যায়। এটা অভিজ্ঞ চিকিৎসক পেটে হাত দিয়ে পরীক্ষা করেও অনেক সময় বুঝতে পারেন।

নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি  লিভার শনাক্ত করার উপায়ঃ
আগেই বলা হয়েছে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফ্যাটি লিভারের কোন লক্ষণ-উপসর্গ প্রকাশ পায় না। অন্য কোন কারণে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে গিয়ে এটা ধরা পড়ে। রক্ত পরীক্ষা করেও লিভারের সমস্যা সম্পর্কে কিছুটা আঁচ করা যায়।
রক্তে লিভারের এনজাইম বেড়ে গেলে অনেক সময় চিকিৎসকের মনে সন্দেহ জাগে। সেক্ষেত্রে বাড়তি পরীক্ষা করলেই এটা শনাক্ত হতে পারে। তবে এসব ক্ষেত্রে সকল চিকিৎসকই নিশ্চিত হতে চান যে এরকম অবস্থা অতিরিক্ত মদপানের কারণে হচ্ছে না। কারণ মদ পানের পরিমাণ বেশী হলেও লিভারের পরীক্ষার ফলাফল অস্বাভাবিক হয়ে থাকে।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে পেটের আলট্রাসোনোগ্রাম করালে লিভারে অতিরিক্ত চর্বির উপস্থিতি শনাক্ত করা যায়। পেটের সিটি স্ক্যান করালেও এটা দেখা যায়। ফ্যাটি লিভার থেকে জটিলতা হিসেবে সিরোসিস হয়ে গেলে সেটাও শনাক্ত করা সম্ভব। এসব ক্ষেত্রে রোগীর লিভারের পাশাপাশি প্লীহাও বড় হয়ে যায়।
তবে নন- অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার সবচেয়ে ভালো উপায় লিভার বায়োপসি করে তা পরীক্ষা করে দেখা। এরজন্য লিভারের ভিতরে বিশেষ ধরণের সুঁই ঢুকিয়ে সামান্য পরিমাণ লিভার টিস্যু বের করে নিয়ে হিস্টোপ্যাথলজি পরীক্ষা করতে হয়। এটা জটিল এবং ঝুঁকিপূর্ণ বিধায় সবসময় করা সম্ভব হয় না। কিন্তু লিভার বায়োপসি এবং হিস্টোপ্যাথলজির সুবিধা হচ্ছে এটা একটি নিশ্চিত পরীক্ষা; এর মাধ্যমে লিভারে চর্বি জমার অন্য কোন কারণ থাকলে সেটাও বের করা সম্ভব। তাছাড়া লিভারের প্রদাহ বা স্টিয়াটোহেপাটাইটিস কিংবা সিরোসিস হয়েছে কিনা সে সম্পর্কেও নিশ্চিত হওয়া যায়। 
আজকাল ফ্যাটি লিভারের আরও কিছু আধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার উপায় আবিষ্কৃত হয়েছে।


পথ্য এবং চিকিৎসাঃ  
নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রধান উপায় ওজন কমানো । আর ওজন কমাতে হলে অবশ্যই সঠিক পরিমাণে সুষম খাদ্য গ্রহণ করা জরুরী। এরজন্য আমাদের করণীয়ঃ
·       পরিমিত পরিমাণে সুষম খাবার গ্রহণ করতে হবে   
·       যথেষ্ট পরিমাণে ফল এবং সবজি খেতে হবে
·       চিনি এবং মিষ্টিজাতীয় খাবারের পরিমাণ সীমিত রাখতে হবে
·       খাবারে লবণের পরিমাণ কমাতে হবে।
সুষম খাবার খেলে এবং নিয়মিত ব্যায়াম করলে শুধু  যে নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার থেকে মুক্তি পাওয়া যায় তা নয়; অন্যান্য রোগ-ব্যাধি এবং ঝুঁকি (যেমন- ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত কোলেস্টেরল, উচ্চ রক্তচাপ) থেকেও পরিত্রাণ পাওয়া যায়। আর এর ফলে ডায়াবেটিসের জটিলতা এবং হৃদরোগ হওয়ার সম্ভাবনাও কমে যায়।

অনেকেই মনে করেন নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার কোন গুরুতর সমস্যা নয়। কিন্তু  আসলে তা সত্য নয়। এটা অনেক গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকির অগ্রিম বার্তা বহন করে। কিন্তু সময়মতো সচেতন হলে ডায়াবেটিসের অনেক জটিলতা এবং হৃদরোগ থেকে আমাদের মুক্ত রাখতে সহায়তা করে। নন-অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার নিরাময় করার যাদুকরী কার্যকর কোন ওষুধ নেই। শুধুমাত্র সুষম খাবার খাওয়া, নিয়মিত ব্যায়াম করা এবং লাইফস্টাইল পরিবর্তনের মাধ্যমে আমরা এই সমস্যা এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক জটিলতা থেকে মুক্ত থাকতে পারি।   

Tuesday, 28 February 2017

মদ্যপানজনিত যকৃতের রোগ বা অ্যালকোহলিক লিভার ডিজিজ



মদ্যপানজনিত যকৃতের রোগ বা অ্যালকোহলিক লিভার ডিজিজ
 (Alcoholic Liver Disease)   

অতিরিক্ত মদপান করলে লিভারে চর্বি জমে, প্রদাহ সৃষ্টি হয় এবং পরবর্তীতে লিভারের ক্ষত শুকিয়ে গুটি গুটি ফাইব্রোসিস  এবং শেষ পর্যন্ত লিভার সিরোসিস হয়। পশ্চিমা জগতে  লিভারের রোগসমূহের   মধ্যে    মদ্যপানজনিত লিভারের রোগই প্রধান। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশে লিভারের রোগের প্রধান কারণ ভাইরাসজনিত যকৃত প্রদাহ।  
মার্কিন রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের হিসেব অনুসারে ২০১৩ সালে মদ্যপানজনিত লিভারের রোগে  ১৮,১৪৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। ক্রনিক লিভারের রোগ এবং সিরোসিসের কারণে প্রতি লাখে ১১ জনের মৃত্যু হয়। 

লিভারের কাজ এবং গুরুত্ব 
মানুষের শরীরে মস্তিষ্কের পরে গঠন এবং কাজকর্মের দিক দিয়ে লিভার অতি জটিল। লিভার ৫০০-এর বেশী কাজ করে থাকে। এদের মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য কাজ হচ্ছেঃ 
·       লিভারে রোগ সংক্রমণ প্রতিরোধকারী প্রোটিন তৈরি করে   
·       রক্তের বিভিন্ন বিষাক্ত উপাদান বা টক্সিন পরিশোধন করে  
·       হরমোন, প্রোটিন, এবং অনেক রকম রাসায়নিক উপাদান তৈরি করে   
·       রক্তের কোলেস্টেরল এবং গ্লুকোজের মাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা পালন করে    
·       রক্ত জমাট বাঁধার জন্য প্রয়োজনীয় উপাদানসমূহ তৈরি করে  
·       গ্লাইকোজেন এবং আরও প্রয়োজনীয় উপাদান সঞ্চিত রাখে।  
লিভার ক্ষতিগ্রস্থ হলে আমাদের সারা দেহের কাজকর্মের উপর প্রভাব পড়ে। কোন কারণে লিভারের ক্ষত শুরু হলেও তার প্রভাব প্রকাশিত হতে অনেক সময় লাগে। কারণ লিভারের যেকোনো ক্ষত দ্রুত নিরাময় হয় এবং বিনষ্ট লিভার টিস্যু পুনর্জননের ক্ষমতা রয়েছে। এজন্য লিভারের ক্ষতের লক্ষণ-উপসর্গ ধরা পড়া কিংবা প্রকাশিত হওয়ার অর্থ তা বহুদূর অগ্রসর হয়েছে।   

মদ্যপানজনিত যকৃতের রোগের কারণ
অনেকেই মদপান করে থাকে। কিন্তু সকলের লিভারে সমস্যা হয় না। মদ খেলে কারও লিভার ক্ষতিগ্রস্থ হয় আর কারও লিভারে কোন সমস্যা হয় না। কেন এমন হয় তার সঠিক কারণ জানা নেই।
অ্যালকোহল বা ইথানল লিভারে বিপাকের পরে অ্যাসিটালডিহাইডে পরিণত হয়। এটা লিভারের কোষ বিনষ্ট করে এবং এক পর্যায়ে লিভারের গাঠনিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। বিনষ্ট লিভারের অংশ শুকিয়ে গেলে সেখানে যে স্কার টিস্যু তৈরি হয় তা আর লিভারের কাজ করতে পারে না। এবং এভাবেই একসময় পুরো লিভার একসময় অকেজো হয়ে যায়।  লিভারের এই নষ্ট হওয়ার প্রক্রিয়াটি কারও ক্ষেত্রে খুব দ্রুত ঘটে; কারও ক্ষেত্রে তেমন নয়। আগেই বলা হয়েছে কেন এমন হয় তা এখনও জানা যায়নি।

মদ্যপানজনিত যকৃতের রোগের ঝুঁকিসমূহ 
বিভিন্ন কারণে অ্যালকোহলিক লিভার ডিজিজ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।  
সব ধরণের মদে লিভারের একই রকমের ক্ষতি হয় না। ওয়াইন পান করার চেয়ে যারা বিয়ার, লিকার অথবা স্পিরিট পান করে তাদের লিভার বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়।
পুরুষদের চেয়ে মহিলাদের শরীরে ধীরে ধীরে মদের বিপাক ক্রিয়া ঘটে। এজন্য মদ খেলে মহিলাদের লিভার সহজেই ক্ষতিগ্রস্থ হয়। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে দেখা যায় মহিলাদের লিভার মদের প্রতি পুরুষদের চেয়ে দ্বিগুণ সংবেদনশীল।  এক হিসেবে দেখা যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শতকরা ১৩ জন মহিলা সপ্তাহে সাত গ্লাসের বেশী মোদ পান করে থাকে। যারা বেশী পরিমাণে মদ পান করে এবং যাদের ওজন বেশী তাদের ক্রনিক লিভারের রোগ  হওয়ার সম্ভাবনা যেমন বেশী তেমন এর কারণে মৃত্যুর সম্ভাবনাও বেশী। যারা নিয়মিত  মদপান করে তাদের হেপাটাইটিস সি ভাইরাস সংক্রমণ থাকলে লিভারের ক্রনিক রোগ হওয়ার সম্ভাবনা আরও বেড়ে যায়। 
বংশগতি বা জিনের গঠনের কারণেও ক্রনিক লিভারের রোগ বেশী হওয়ার ঝুঁকি থাকতে পারে। সাধারণত লিভারে বিপাক ক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এনজাইমের জিন গঠনে কোন পরিবর্তন ঘটলে এমন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

মদ্যপানজনিত যকৃতের রোগের পর্যায়সমূহ
অ্যালকোহলিক লিভারের রোগ সাধারণত কয়েকটি পর্যায়ে অতিক্রম করেঃ

অ্যালকোহলিক ফ্যাটি লিভার 
অতিরক্ত মদ পান করলে লিভারে ফ্যাটি অ্যাসিড জমতে শুরু করে। অনেক সময় অতিরিক্ত মদ পান করলে এমন কি সপ্তাহখানেকের মধ্যেও এমন হতে পারে। এ পর্যায়ে লিভারের সমস্যার কোন লক্ষণ-উপসর্গ প্রকাশ পায় না।  এই পর্যায়ে মদ পান করা থেকে বিরত থাকলে লিভারের চর্বি জমা থেমে যায় এবং সপ্তাহ দুয়েকের মধ্যে লিভার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যেতে পারে।
কিন্তু লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমলে ক্রমশ বিভিন্ন লক্ষণ-উপসর্গ প্রকাশিত হতে থাকে। যেমনঃ শরীর অতিরক্ত দুর্বল হয়ে পড়ে, বমি বমি ভাব হয়, পেটে ব্যথা হতে পারে, ক্ষুধা কমে যায় এবং সার্বিকভাবে অসুস্থ বোধ হতে পারে। 

অ্যালকোহলিক  হেপাটাইটিস বা  মদ্যপানজনিত যকৃত প্রদাহ 
“হেপাটাইটিস” শব্দের অর্থ লিভার বা যকৃতের প্রদাহ। অ্যালকোহল লিভারের প্রদাহ সৃষ্টি করতে   পারে। অনেকদিন নিয়মিত অতিরিক্ত মদ খেলে এমন হয়।  তবে স্বল্প সময়ের মধ্যে অতিরিক্ত মদ পানের কারণেও প্রদাহ হতে পারে। কয়েক মাস মদ পান করা থেকে বিরত থাকলে অ্যালকোহলিক হেপাটাইটিস নিরাময় হতে পারে। অনেকের প্রদাহ প্রশমিত হতে হতে কয়েক বছর পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।
অ্যালকোহলিক হেপাটাইটিসের লক্ষণ-উপসর্গের মধ্যে রয়েছে পেটে ব্যথা, জন্ডিস, অতিরিক্ত দুর্বলতা, জ্বর, বমি বমি ভাব, ক্ষুধামন্দা ইত্যাদি। 

ফাইব্রোসিস  
ফাইব্রোসিস  এমন একটি প্রক্রিয়া যার ফলে লিভারে কোলাজেন নামে পরিচিত এক ধরণের প্রোটিন অতিরিক্ত জমে যায়। অধিকাংশ ক্রনিক লিভারের সমস্যার ক্ষেত্রেই এটা ঘটে থাকে। ফাইব্রোসিস প্রক্রিয়া বেশীদূর অগ্রসর হলে তা সিরোসিসের রূপ ধারণ করে। 

সিরোসিস 
লিভারে অনেকদিন ধরে প্রদাহ চলতে থাকলে কোষসমূহ বিনষ্ট হয়ে লিভারের গাঠনিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। লিভারের নষ্ট হয়ে যাওয়া অংশে অতিরিক্ত কোলাজেন জমে অসংখ্য গুটি গুটি তৈরি হয়। এভাবে নষ্ট হয়ে শুকিয়ে যাওয়া লিভার আর প্রয়োজনীয় কাজ করতে পারে না। ফলে একটি মারাত্মক প্রাণঘাতী পরিস্থিতির সৃষ্টি হয় যা সিরোসিস নামে পরিচিত। সিরোসিসের ক্ষতি অপূরণীয়। অর্থাৎ একবার সিরোসিস হলে লিভারে যে পরিবর্তনগুলি ঘটে তা আর কখনও পূর্বাবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। তবে মদ পান করা থেকে বিরত থাকলে লিভারের আরও ক্ষতি হওয়া প্রতিরোধ করা যায়। লিভারের ক্ষতির পরিমাণ খুব বেশী হলে লিভার ট্রান্সপ্লানটেসন বা যকৃত প্রতিস্থাপন করতে হয়। 
লিভার সিরোসিসের প্রাথমিক পর্যায়ে রোগী অবসন্নতা এবং দুর্বলতা অনুভব করে। খাওয়ার রুচি কমে যায়, ওজন হ্রাস পায়, হাতের তালু রক্ত বরণ হতে পারে, শরীর চুলকায়, পেটে ব্যথা হয় এবং ঘুমের অনিয়ম হয়। সিরোসিস আরও অগ্রসর হলে শরীরের বিভিন্ন স্থানের চুল পড়ে যায়, ওজন আরও কমতে থাকে, জন্ডিস হতে পারে, প্রসাবের রঙ খুব হলুদ হয়, শরীরের বিভিন্নস্থান থেকে রক্তক্ষরণের প্রবণতা দেখা দেয়, যৌন ক্ষমতা কমে যায়, হাত-পায়ে পানি জমে যায়, রক্ত বমি হয়, পায়খানার সঙ্গে রক্ত যায়, পেটে পানি জমে ফুলে যায়, ব্যক্তিত্বের পরিবর্তন হয়, চেতনা লোপ পায়, শরীরে বিভিন্নরকম জীবাণুসংক্রমণসহ আরও নানারকম সমস্যা হতে থাকে।  
লিভার মদ, ওষুধ এবং অন্যান্য বিষাক্ত উপাদান বিপাক এবং নিষ্কাশন করে। সিরোসিস হলে লিভার আর তা করতে পারে না। ফলে খুব সহজেই বিভিন্নরকম ওষুধ এবং বিষাক্ত উপাদানের ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া ঘটতে থাকে।  

মদ্যপানজনিত যকৃতের রোগ প্রতিরোধের উপায় 
অ্যালকোহলিক লিভার ডিজিজ প্রতিরোধ করার সহজ উপায় মদপান করা থেকে বিরত থাকা। 
যারা মদপান ছাড়তে পারে না, তাদের অবশ্যই পানের পরিমাণ মেনে চলতে হবে।
মদপানের স্বীকৃত নীতিমালা অনুসারে ২১ বছর কিংবা তার চেয়ে বেশী বয়সী একজন মহিলা দিনে এক সার্ভ  এবং একজন পুরুষ দুই সার্ভ মদ পান করতে পারে। ওয়ান ড্রিঙ্ক বা এক সার্ভ মদ ৫% অ্যালকোহলযুক্ত ১২ আউন্স (৩৬০ মিলিলিটার) বিয়ার, ১২% অ্যালকোহলযুক্ত ৫ আউন্স(১৫০ মিলিলিটার) ওয়াইন বা ৪০% অ্যালকোহলযুক্ত দেড় আউন্স (৪৫ মিলিলিটার) স্পিরিটের সমতুল্য। 
মহিলাদের জন্য দিনে চার সার্ভ কিংবা সপ্তাহে আট সার্ভের বেশী এবং পুরুষদের জন্য দিনে পাঁচ সার্ভ কিংবা সপ্তাহে পনের সার্ভের বেশী মদ পান করা অতিরিক্ত ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনা করা হয়।  
দুই ঘণ্টার মধ্যে কোন মহিলা চার সার্ভ কিংবা তারচেয়ে বেশী এবং কোন পুরুষ পাঁচ সার্ভ কিংবা তারচেয়ে বেশী মদ খেলে সেটাকে “বিনজ ড্রিংকিং” (Binge drinking) বলা হয়। সকলের শরীরের গঠন একরকম নয় এবং মদ বিপাক করার ক্ষমতাও একরকম নয়। এজন্য একই পরিমাণ মদপান করে একজন সহ্য করতে পারলে, অন্য আরেকজন অসুস্থ বোধ করতে পারে।