শরীর ও মন নিয়ে লেখালেখি

Tuesday, 11 February 2014

পৃথিবীর শতকোটি ধূমপায়ী

বিশ্বের অনেক দেশে ধূমপানের প্রবণতা কমেছে। কিন্তু তারপরও মোট ধূমপায়ীর সংখ্যা বেড়েই চলেছে। ২০১২ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্বে প্রতিদিন ১৮৭টি দেশে ৯৬৭ মিলিয়ন মানুষ ধূমপান করে। উল্লেখ্য ১৯৮০ সালে এই সংখ্যা ছিলো ৭২১ মিলিয়ন।
পৃথিবীর মোট জনসংখ্যা বেড়ে যাওয়ার কারণে ধূমপায়ীর সংখ্যা বেড়ে গিয়েছে। গত ৫০ বছরে পৃথিবীর জনসংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। ফলে ধূমপানে অভ্যস্ত মানুষের সংখ্যাও বেড়েছে। হিসেবে দেখা যায় ১৯৯৬ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত ধূমপানের প্রবণতা কমছিল । কিন্তু ২০১০ সাল থেকে পুরুষদের মধ্যে ধূমপানের হার বেড়ে চলেছে। এর জন্য সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশ, চীন, ইন্দোনেশিয়া ও রাশিয়াসহ আরো বেশ কিছু দেশে ধূমপায়ীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়াকে দায়ী করা হয়েছে।
বলা হচ্ছে ২০১২ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ৬.২৫ ট্রিলিয়ন সিগারেট পান করা হয়েছে; অর্থাৎ প্রত্যেকে ২০ শলা করে ধূমপান করেছে। ১৯৮০ সালে এই সংখ্যা ছিলো ৪.৯৬ ট্রিলিয়ন। বর্তমানে ১০ জন পুরুষের মধ্যে ৩ জন এবং ২০ জন নারীর মধ্যে ১ জন ধূমপান করেন; ১৯৮০ সালে এই হার ছিলো ১০ জন পুরুষে ৪ জন এবং ১০ জন নারীর মধ্যে একজন।
বিশ্বের যেসব দেশে ধূমপানের ব্যাপকতা রয়েছে তাদের মধ্যে সবচেয়ে ওপরে আছে পূর্ব তিমুরের নাম। দেশটির ৬১ শতাংশ মানুষ প্রতিদিন ধূমপান করেন। এরপরেই রয়েছে ইন্দোনেশিয়া। আর সবচেয়ে নিচে আছে ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের দেশ অ্যান্টিগুয়া ও বারবুডা।সেখানে প্রতিদিন মাত্র ৫ শতাংশ মানুষ ধূমপান করেন।
ধূমপানের অভ্যাস থেকে জনগণকে ফিরিয়ে আনতে, বন্ধ করতে বা কখনো ধূমপান না করার জন্য উৎসাহ দেয়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সফল হয়েছে নরওয়ে, সুইডেন, কানাডা, ও মেক্সিকো।
পঞ্চাশ বছর আগে আমেরিকার সার্জন জেনারেল ধূমপান প্রতিরোধের সংগ্রাম শুরু করেছিলেন। তখন বলা হয়েছিল ধূমপান করলে ফুসফুসের ক্যানসার হয়। পঞ্চাশ বছর পরে আজ আমরা জানি ধূমপান শরীরের প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গেই কোন না কোন ক্ষতি করে। এমন কি পরোক্ষ ধূমপানও শরীরের জন্য ক্ষতিকর। পঞ্চাশ বছরে ধূমপান প্রতিরোধ করার ক্ষেত্রে অনেক অগ্রগতি হলেও এখনও অনেক কিছু করার রয়েছে। কিন্তু বর্তমান প্রকাশিত পরিসংখ্যানের পড়ে অনেকের মনেই  প্রশ্ন জেগেছে, আমরা কি তা করতে পারবো? আমাদের কি আসলে সে সদিচ্ছা আছে?

 

নিয়মিত ওষুধ সেবনে বাধা কোথায়?

নিয়মিত ওষুধ সেবন না করা এখন রীতিমতো নতুন এক রোগে পরিণত হয়েছে। চিকিৎসকগণ এজন্য খুবই হতাশ । দেখা যাচ্ছে ক্রনিক রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত রোগীদের অধিকাংশই  চিকিৎসকের পরামর্শ মতো ওষুধ সেবন করেন না কিংবা উপদেশ মেনে চলেন না। এরফলে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা এক নতুন ধরণের সংকটের মুখোমুখী হয়েছে।
·         মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বছরে প্রায় চারশো কোটি প্রেসক্রিপশন লেখা হয়। এর মধ্যে অর্ধেক প্রেসক্রিপশনের ওষুধ পুরো ব্যবহার করা হয় না কিংবা একেবারেই ব্যবহার করা হয় না।
·         কয়েক বছর আগে ১০০০ রোগীর ওপর জরীপ করে দেখা গিয়েছে প্রতি চার জনের মধ্যে তিন জন প্রেসক্রিপশনের পরামর্শমতো ওষুধ সেবন করেন না।
·         আরেক পর্যবেক্ষণে দেখা যায় বাণিজ্যিক বীমা করা ৭৫,০০০ রোগীর মধ্যে প্রতি দশজনে তিন জন নতুন প্রেসক্রিপশনের ওষুধ কিনেন না। এমন কি উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস এবং কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধও ২০ থেকে ২২ শতাংশ ক্ষেত্রে কেনা হয়নি।
·         ক্রনিক রোগে আক্রান্তরা প্রেসক্রিপশন অনুসারে ওষুধ কিনলেও অর্ধেক ওষুধই তারা পরামর্শ মতো গ্রহণ করেন না।
·         সঠিক নিয়ম মতো ওষুধ সেবন না করার কারণে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া নিয়ে আবার অনেককে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়। বিভিন্ন নার্সিং হোমে ভর্তি হওয়া রোগীদের প্রতি পাঁচ জনের মধ্যে দুই জন আসলে নিয়মিত ওষুধ সেবন না করার কারণে সৃষ্ট জটিলতার জন্য ভর্তি হতে বাধ্য হয়ে থাকেন।
·         নিয়মিত ওষুধ সেবন না করার কারণে তুলনামূলকভাবে উচ্চ রক্তচাপ, অতিরিক্ত কোলেস্টেরল এবং হৃদরোগীদের মৃত্যু হার দুই থেকে পাঁচ গুণ বেড়ে যায়।
·         এমন কি হার্ট অ্যাটাকের রোগীদের মধ্যেও দেখা যাচ্ছে ওষুধ শুরু করার দুই বছরের মধ্যে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়াই অর্ধেকের বেশী রোগী নিয়মিত ওষুধ সেবন করা ছেড়ে দিয়েছেন।

পরামর্শমতো ওষুধ সেবন না করা এক জটিল সমস্যা। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞগণ এই বিপজ্জনক এবং ব্যয়বহুল প্রবণতার সমাধান কি হবে, তা নিয়ে আসলেই এক গোলক ধাঁধার মধ্যে রয়েছেন।

কোথায় পাবো ওমেগা-৩-ফ্যাটি অ্যাসিড

আজকাল ওমেগা-৩-ফ্যাটি অ্যাসিড সম্পর্কে সকলেরই আগ্রহ বেড়েছে। এটা নিয়ে প্রচার প্রচারণারও অন্ত নেই। প্রশ্ন মূলতঃ কোথায় পাওয়া যাবে ওমেগা-৩-ফ্যাটি অ্যাসিড? বেশীরভাগ প্রচারণায় খাবারে কৃত্রিম উপায়ে যুক্ত ওমেগা-৩-ফ্যাটি অ্যাসিডের প্রতিই সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয় কিংবা ক্যাপসুল আকারে এটা গ্রহণ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করা হয়। কিন্তু আমাদের দৈনন্দিন খাদ্য থেকেই প্রচুর ওমেগা-৩-ফ্যাটি অ্যাসিড পাওয়া সম্ভব।
ওমেগা-৩-ফ্যাটি অ্যাসিড আসলে বিশেষ ধরণের অসম্পৃক্ত ফ্যাটি অ্যাসিড। অনেক সময় এদের পলি ফ্যাটও বলা হয়। সবচেয়ে সরল ওমেগা-৩-ফ্যাটি অ্যাসিডের নাম আলফা লিনোলিনিক অ্যাসিড। আমাদের শরীরে এটা তৈরি হয় না। এজন্য খাবারের মাধ্যমে এটা গ্রহণ করতে হয়। অন্যথায় শরীরে এর ঘাটতি পড়ে যায়। তবে আনন্দের বিষয় হচ্ছে বেশীরভাগ উদ্ভিজ্জ এবং প্রাণীজ খাবারে এটা যথেষ্ট পরিমাণেই পাওয়া যায়। কিন্তু অন্য দুটি ওমেগা-৩-ফ্যাটি অ্যাসিড অর্থাৎ ইকোসাপেনটানোইক অ্যাসিড(eicosapentaenoic acid) এবং ডকোসাহেক্সানোয়িক অ্যাসিড(docosahexaenoic acid)এত সহজে পাওয়া যায় না। সামান্য পরিমাণ আলফা লিনোলিনিক অ্যাসিড শরীরে রূপান্তরিত হয়ে ওই দুই রকম ওমেগা-৩-ফ্যাটি অ্যাসিড তৈরি করতে পারলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য। কিন্তু হৃদপিণ্ড, ত্বক, মস্তিস্ক এবং আরও অনেক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের সুরক্ষার জন্য শেষোক্ত দুই রকমের ওমেগা-৩-ফ্যাটি অ্যাসিডের প্রয়োজনই বেশী। অতএব শরীরের সুরক্ষার জন্য আমাদের ইকোসাপেনটানোইক অ্যাসিড এবং ডকোসাহেক্সানোয়িক অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবার অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে।
দৈনিক আমাদের কতটুকু ওমেগা-৩-ফ্যাটি অ্যাসিড গ্রহণ কড়া উচিৎ? এ সম্পর্কে মতভেদ থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে দৈনিক ১ থেকে ৪ গ্রাম ওমেগা-৩-ফ্যাটি অ্যাসিড গ্রহণ করার সুপারিশ করা হয়। অতিরিক্ত ওমেগা-৩-ফ্যাটি অ্যাসিড গ্রহণ করলে আবার কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া কিংবা ক্ষতিকর প্রতিক্রিয়া হতে পারে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে কোন কোন খাবারে ওমেগা-৩-ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে?  
তিসির বীজ (flaxseed or linseed) এবং আখরোটে (wallnut) প্রচুর ওমেগা-৩-ফ্যাটি অ্যাসিড পাওয়া যায়। পোয়া কাপ পরিমাণ তিসির বীজ থেকে ৬ থেকে ৮ গ্রাম ওমেগা-৩-ফ্যাটি অ্যাসিড পাওয়া যায়। আর সম পরিমাণ আখরোট থেকে প্রায় ৩ গ্রাম ওমেগা-৩-ফ্যাটি অ্যাসিড পাওয়া সম্ভব। আমাদের শরীরের জন্য যে পরিমাণ ওমেগা-৩-ফ্যাটি অ্যাসিড দরকার তা পেতে হলে দৈনিক এক টেবিল চামচ তিসির বীজ কিংবা তেল এবং পোয়া কাপ পরিমাণ আখরোট খেলেই যথেষ্ট। এরফলে আমরা প্রায় ৪ গ্রামের বেশী ওমেগা-৩-ফ্যাটি অ্যাসিড পেতে পারি।
এ ছাড়া ওমেগা-৩-ফ্যাটি অ্যাসিডের খুব সমৃদ্ধ উৎস বিভিন্ন ধরণের সামুদ্রিক মাছ। যেমনঃ স্যামন, সারডিন, হেরিং, ম্যাকারেল,  টুনা ইত্যাদি।  সাধারণত ৪ আউন্স এধরণের মাছ খেলে ১ থেকে ২ গ্রাম ওমেগা-৩-ফ্যাটি অ্যাসিড পাওয়া যায়। মিষ্টি পানির মাছে  ওমেগা-৩-ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ তুলনামূলকভাবে কম। তবে পাঙাশ, বিভিন্ন রকম কার্প , ট্রাউট  ইত্যাদি মাছেও ওমেগা-৩-ফ্যাটি অ্যাসিড পাওয়া যায়।
জলপাইয়ের তেলেও ওমেগা-৩-ফ্যাটি অ্যাসিড প্রচুর পরিমাণে থাকে। প্রতি আউন্স জলপাইয়ের তেলে ১০০ মিঃ গ্রাম ওমেগা-৩-ফ্যাটি অ্যাসিড থাকে। এছাড়া সরিষার তেল, সয়াবিন তেল, ক্যানোলার তেলে ওমেগা-৩-ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ যথেষ্ট। সরিষা গোত্রের অন্যান্য সবজী যেমনঃ বাঁধাকপি, ফুল কপি, শালগম, মূলা, ওয়াসাবি ইত্যাদিতে ওমেগা-৩-ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ অনেক।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে মাছ, বাদাম কিংবা তেল ভাজলে কিংবা অতিরিক্ত তাপে রান্না করলে ওমেগা-৩-ফ্যাটি অ্যাসিড নষ্ট হয়ে যায়। অতএব পরিমাণ মতো ওমেগা-৩-ফ্যাটি অ্যাসিড পেতে হলে এসব খাবার কাঁচা গ্রহণ করতে হবে অথবা এমন ভাবে রান্না করতে হবে যেন উত্তাপে নষ্ট হয়ে না যায়। কিন্তু দৈনন্দিন জীবনে তা অনেক সময় সম্ভব হয়ে ওঠেনা । এজন্য আজকাল অধিকাংশ খাবারে ওমেগা-৩-ফ্যাটি অ্যাসিড পরিপূরক হিসেবে যোগ করা হয়। রুটি, তেল, আটা থেকে শুরু করে ডিম দুধ মাখন ঘি সব কিছুতেই ওমেগা-৩-ফ্যাটি অ্যাসিড যোগ করা হয়। সুপার মার্কেট থেকে কেনার সময় এ সব খাদ্যের মোড়কে ওমেগা-৩-ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ দেখলেই এ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
এরপরেও যাদের দৈনিক ওমেগা-৩-ফ্যাটি অ্যাসিডের চাহিদা পূরণ হয় না, তাদের ওমেগা-৩-ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ ক্যাপসুল সেবন করাই সমাধান।



পরোক্ষ ধূমপান

পরোক্ষ ধূমপান

সহজ কথায় ধূমপানরত ব্যক্তির বিড়ি-সিগারেটের ধোঁয়া দ্বিতীয় ব্যক্তি গ্রহণ করলে সেটাকে পরোক্ষ ধূমপান বলা হয়। এটা দুভাবে আসতে পারে, ধূমপানরত ব্যক্তির জ্বলন্ত বিড়ি কিংবা সিগারেটের পাশ থেকে নির্গত ধোঁয়া কিংবা ধূমপায়ী ধোঁয়া গ্রহণের পর নিঃশ্বাসের সঙ্গে পরিত্যক্ত ধোঁয়া। বিড়ি-সিগারেটের জ্বলন্ত অংশের পাশ থেকে নির্গত ধোঁয়া দিয়ে কোনো একটি কক্ষের মোট ধোঁয়ার ৮৫ শতাংশ ভরে থাকে।

তামাকের ধোঁয়ার উপাদান

তামাকের ধোঁয়ায় চার হাজারের বেশি উপাদান থাকে। এগুলোর মধ্যে যেসব কণা রয়েছে তা হলো—আলকাতরা, নিকোটিন, বেনজিন ও বেনজোপাইরিন। আর গ্যাসীয় উপাদানগুলো রয়েছে কার্বন মনোক্সাইড,  অ্যামোনিয়া,  ডাই-মিথাইল নাইট্রোস অ্যামাইন, ফরমালডিহাইড, হাইড্রোজেন সায়ানাইড ও অ্যাক্রোলিন। এক হিসাবে দেখা যায়, তামাকের ধোঁয়ায় অন্তত ৬০ রকমের উপাদান রয়েছে, যেগুলো ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে। আর শ্বাসনালির জন্য উত্তেজক যে কত উপাদান রয়েছে তার ইয়ত্তা নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থা (Environment protection agency) তামাকের ধোঁয়াকে অ্যাসবেস্টস এবং আর্সেনিকের মতোই প্রথম শ্রেণীর ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদান হিসেবে গণ্য করে।

পরোক্ষ ধূমপানের অপকারীতা

পরোক্ষ ধূমপানের কারণে শিশুদের শ্বাসনালীর নানারকম সমস্যা হয়। অনেক শিশুর মধ্য কর্ণের সংক্রমণ হতে পারে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে পরোক্ষ ধূমপানের কারণে শিশুদের সহসা মৃত্যু হতে পারে।
অন্যের ধোঁয়া পান করলে চোখ জ্বালাপোড়া, মাথাব্যথা, গলাব্যথা, বমি বমি ভাব ইত্যাদি হয়। হাঁপানির রোগীর হাঁপানির প্রকোপ বাড়ানোর জন্য পরোক্ষ ধূমপান বিশেষ ভূমিকা পালন করে।


দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতি

বাড়িতে পরোক্ষ ধূমপানের ফলে হৃদরোগ এবং ফুসফুসের ক্যানসারের প্রকোপ ২৫ শতাংশ বেড়ে যায়। আর কর্মস্থল এবং পথেঘাটে পরোক্ষ ধূমপানের ফলে হৃদরোগের হার বেড়ে যায় ৫০-৬০ শতাংশ। অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য প্রতিবেদনে দেখা যায়, অধূমপায়ীদের ফুসফুসের ক্যানসার এবং হৃদরোগের কারণ পরোক্ষ ধূমপান।গর্ভবতী মায়েরা পরোক্ষ ধূমপানের শিকার হলে তাদের গর্ভস্থ শিশুর ওজন কমে যায়। সম্প্রতি প্রমাণিত হয়েছে যে পরোক্ষ ধূমপানের কারণে মস্তিস্কের স্ট্রোকও হতে পারে। তবে পরোক্ষ ধূমপানের সঙ্গে ডায়াবেটিসের সম্পর্কের এখনও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে অনেক গবেষক ডায়াবেটিসের সঙ্গে পরোক্ষ ধূমপানের সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করছেন। 

পরোক্ষ ধূমপানের ব্যাপকতা

প্রকৃতপক্ষে এর ব্যাপকতা অনেক বিস্তৃত। এক হিসাবে দেখা যায়, ব্রিটেনের অর্ধেক শিশুই বাড়িতে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার। ধূমপায়ী মা-বাবার শিশুদের মধ্যে শ্বাসনালির রোগব্যাধির প্রকোপ তুলনামূলকভাবে বেশি।

উন্মুক্ত স্থানে ধূমপান নিষিদ্ধ করে বাংলাদেশ একটি ভালো দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। কিন্তু আমাদের পরোক্ষ ধূমপানের বিরুদ্ধেও সচেতন হতে হবে। ঘরের ভেতর ধূমপান করলে তা ধূমপায়ীর জন্য তো বটেই, সঙ্গে সঙ্গে তা তার পরিবারের অন্যদের, বিশেষত শিশু এবং গর্ভবতী মায়েদের জন্যও ক্ষতিকর।


তথ্যসূত্রঃ  The Health Consequences of Smoking—50 Years of Progress: A Report of the Surgeon General. Atlanta, GA: U.S. Department of Health and Human Services, Centers for Disease Control and Prevention, National Center for Chronic Disease Prevention and Health Promotion, Office on Smoking and Health, 2014.

ক্লান্ত চিকিৎসক

মানুষকে সুস্থ করে তোলার ইচ্ছে এবং সাহায্য করার স্বপ্ন বুকে ধারণ করে তারা আসে। অর্থ বিত্তের পাশাপাশি একজন অসুস্থ অসহায় ব্যক্তিকে সুস্থ করে তোলার মধ্যে যে স্বর্গীয় আনন্দ আছে, তার মধুর তৃপ্তিই তার পেশার প্রতি তাকে আকৃষ্ট করে তোলে। অবশ্যই কাজটি সহজ নয়। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস অবিরাম গুরুতর অসুস্থ রোগীদের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টার কমতি না থাকলেও আসলে অনেককেই সন্তুষ্ট করা যায় না। অনেকের সুস্থ হওয়ার ইচ্ছেও থাকে না।   
সময়ের পরিক্রমায় একটু একটু করে হতাশা জেঁকে বসতে শুরু করে। তৃপ্তির মাঝেও এক সময় উঁকি দিতে শুরু করে তিরিক্ষে মেজাজ। এটা ঠিক নয় - বোঝা সত্ত্বেও তা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয় না। বিশেষজ্ঞগণ এটাকে এখন বলছেন “ডাক্তারের ক্লান্তি” বা “সহানুভূতির ক্লান্তি” (compassion fatigue)। এটা এক ধরণের মানসিক চাপজনিত সমস্যা। দীর্ঘদিন অসুস্থ মানুষকে সেবাদানের মধ্যে থাকলে সেবাদানকারীর ভিতরে এক গভীর শারীরিক, মানসিক এবং আত্মিক অবসাদ তৈরি হয়। তাকেই বলা হচ্ছে সহানুভূতির ক্লান্তি। এই শব্দ ১৯৯২ সালে প্রথম ব্যবহার করা হয়। জরুরী বিভাগে অনেকদিন কাজ করার ফলে একজন নার্স সহসা অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়লে তাকে এই সমস্যায় আক্রান্ত বলে চিহ্নিত করা হয়। পরবর্তীতে চিকিৎসকসহ সেবাদানকারী অনেকের মধ্যেই এ সমস্যা শনাক্ত হয়েছে। বর্তমানে বলা হচ্ছে অতি ব্যস্ত চিকিৎসকদের মধ্যে এ ধরণের অবসাদ বা ক্লান্তির প্রকোপ সবচেয়ে বেশী।  
গতবছর ২৪,০০০ চিকিৎসকের জীবনাচরণের উপর একটি সমীক্ষা(2013 Physician Lifestyle Report) করা হয়েছে। এতে অনেক চিকিৎসকই তাদের জীবনের সমস্ত উৎসাহ-আনন্দ নিভে যাওয়ার পিছনে মূলত সহানুভূতির অবসাদকে দায়ী করেছেন। একজন চিকিৎসক লিখেছেন, “এত গুরুতর রোগীর বেদনাদায়ক ইতিহাস, এত চাপ আর এত লেখালেখি করে আমি আর তাদের জন্য সহানুভূতির জানালা খুলে রাখতে পারিনা”।
“রোগীই প্রথম, রোগীর জন্যই সবকিছু” – এ রকম মহৎ শিক্ষা শুনতে ভালো মনে হলেও, একসময় সেটাই হয়ে ওঠে বিভীষিকাময়। বলা হচ্ছে প্রতিটি মানুষেরই শারীরিক, মানসিক এবং আত্মিক সামর্থের একটি সীমা আছে। এ সামর্থের ওপর নির্ভর করে একজন চিকিৎসক কতক্ষণ ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে তার রোগীকে সাহায্য করতে পারবেন। তার নিজের জীবনী  শক্তির ভাণ্ডার যদি শূন্য হয় তিনি রোগীর জন্য ইতিবাচক কিছু করতে পারেন না।
এই অবস্থা সহসা হয় না।
দিনের পর দিন বৈরি কর্ম পরিবেশে অতিরিক্ত চাপের মধ্যে থেকে কাজ করলে সাধারণত সহানুভূতির ক্লান্তি সৃষ্টি হয়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে চিকিৎসকগণ নিজের শরীর নিয়ে তেমন ভাবেন না। বলা হয়, “একজন চিকিৎসক সবচেয়ে খারাপ রোগী।” কারণ তিনি নিজের যত্ন নেনও না, আবার অন্য চিকিৎসকের পরামর্শও মেনে চলতে চান না। দীর্ঘদিনের চিকিৎসা শিক্ষা তাকে মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড়িয়ে নিরাসক্তভাবে কাজ করার জন্যই উৎসাহিত করেছে। সেখানে একজন চিকিৎসক নিজের মনের আবেগ-দুঃখ নিয়ে চিন্তা করা লজ্জাজনক মনে করেন।
তবে গ্রামের হাসিখুশি সহজ-সরল সদালাপী চিকিৎসককে নিয়ে অনেক কথা বলা যায়। তার পাশে আসলে যে অভয় এবং সাহস মেলে, তা অতুলনীয়; মনে হয় যেন তিনি সহানুভূতির এক মহা খনি। কিন্তু আধুনিক জটিল চিকিৎসা ব্যবস্থা আমাদের সে অবস্থা অনেকটা পালটে দিয়েছে। এখন চিকিৎসকের নিকটে মানুষের চাওয়া অনেক বেশী; যান্ত্রিক জীবনের যাঁতাকলে পিষ্ট মানুষ রোগে-শোকে এখন মানবিক হৃদয়ের ছোঁয়া, সহানুভূতির সুধা চিকিৎসকের নিকটে আশা করে। সেখানে চিকিৎসকের নিজের মনের বাগানে যদি সুস্থতা না থাকে, তাহলে রোগীদের আশা পূরণ না হওয়াটাই স্বাভাবিক। সিনক্লেয়ার লিউইস ১৯২৫ সালে  Arrowsmith নামে একটি উপন্যাস লিখেছিলেন। সেখানে চিকিৎসকদের মনোজগতের সংকটের একটি সুন্দর বর্ণনার সঙ্গে আজকের অবস্থার অনেক প্রতিচ্ছবি পাওয়া যায়। কিন্তু আধুনিক মেডিসিন চিকিৎসকদের জন্য অনেক নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে। সংকট এসেছে আর্থিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং বৈজ্ঞানিক সবক্ষেত্র থেকেই। পরিবর্তিত এ পরিস্থিতিতে মানুষের কল্পনার চিকিৎসক আর বাস্তব চিকিৎসকের মধ্যে ফারাক দিনে দিনে প্রকট হয়ে উঠছে।  সেখানে ব্যক্তি চিকিৎসক নিজেই অসহায়, কিন্তু সমাজ ভস্ম হয়ে যাওয়া চিকিৎসককে সাহায্যের ছায়া দিতে পারছে না, অনেক সময় সে প্রয়োজনীয়তাও অনুভব করতে পারছে না।
আজকের সমাজ চিকিৎসকের জবাবদিহিতার জন্য, দায়বদ্ধতার জন্য যতটা আগ্রহী এবং চিকিৎসকের প্রতিটি পদক্ষেপের জন্য যে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে, তা তাদেরকে আরও অধিকতর চাপের মুখে কাজ করতে বাধ্য করছে। পরিবর্তিত হাসপাতাল কাঠামো, রাজনীতি, পদে পদে ম্যালপ্রাকটিসের হুমকি আর হাজার রকমের পুনর্গঠন আজ একজন চিকিৎসককে ক্ষমতাবিহীন অসহায় জীবে পরিণত করেছে। সেখানে একজন আধুনিক চিকিৎসকের বুক ভরে মুক্ত বাতাসে শ্বাস নেওয়াটাও স্বপ্নের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। একজন বলেছেন, “পরিস্থিতি এমনই শ্বাসরুদ্ধকর যে আপনি প্রতিমুহূর্তে আতঙ্কিত থাকবেন না জানি এই কখন আপনার এত বছরের অর্জিত মানসম্মান ভূলুণ্ঠিত হয়”।
অসহায় অসুস্থ রোগীদের সেবা করার জন্য চিকিৎসকের যে মানসিক শান্তি, স্থিরতা এবং উদ্যম দরকার, নানারকম নিয়ম-কানুনের গ্যাঁড়াকলে আজ তা আনুষ্ঠানিক দায়িত্বপালনে পর্যবসিত হয়েছে মাত্র। এরফলে অনেকেই মানসিক অবসাদে আক্রান্ত, মনে হচ্ছে যেন তাদের সমস্ত উদ্যম-উৎসাহ জ্বলে পুড়ে ছাই হয়ে গিয়েছে। গবেষকগণ বলছেন এ অবস্থার শিকার চিকিৎসকগণ বিশ্রামের জন্য যে সীমিত সময় পান, তা তাদেরকে পুনরায় কাজের জন্য যথেষ্ট উজ্জীবিত করছে না।   
এখন সকলেরই প্রশ্ন এ অবস্থার সমাধান কি?
এক কথায় এর কোন সহজ সমাধান নেই। অনেকে চিকিৎসকদের আচরণ পরিবর্তন কিংবা সহানুভুতি শিক্ষার কোর্সে অংশগ্রহণ করার উপদেশ দিচ্ছেন। কিন্তু এটাতো এমন কোন বিষয় না যা কোর্সের মাধ্যমে শেখানো যাবে। এটা চিকিৎসকের অস্তিত্বের অংশ। দুর্ভাগ্যবশত যখন সহানুভূতি রপ্ত করার জন্য নানাজন উপদেশ বিতরন করেন, তখন তা আরেকটি মানসিক চাপের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এবং তাতে আরও হিতে বিপরীত হয়।
এই নেতিবাচক দুষ্ট চক্র থেকে চিকিৎসকদের মুক্ত হওয়ার জন্য গবেষকগণ যা বলছেন তার সারমর্ম হোল চিকিৎসকদের নিজের প্রতি খেয়াল দিতে হবে। এজন্য তাদের পরামর্শঃ  
  • ·         কাজের ব্যস্ততা কমাতে হবে
  • ·         বিশ্রাম, বিনোদন এবং চিত্তাকর্ষক কার্যক্রমে অংশ নিতে হবে
  • ·         স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণ এবং ব্যায়াম করতে হবে
  • ·         পরিবার এবং নিকট বন্ধুদের সঙ্গে প্রচুর সময় কাটাতে হবে
  • ·         আধ্যাত্মিক উন্নয়নের জন্য সময় দিতে হবে
  • ·         যোগ সাধনা, ধ্যান এবং মানসিক স্থিরতা অর্জনের জন্য সময় দিতে হবে। 

বলা হচ্ছে চিকিৎসক নিজেও একজন মানুষ। তারও সীমাবদ্ধতা আছে। এটা তাকে মেনে নিয়ে কাজ এবং বিশ্রামের মধ্যে একটি সমন্বয় আনতে হবে। প্রয়োজনে সহকর্মীদের সাহায্য এবং পরামর্শ নিতে হবে।
সবশেষে দালাই লামার কথা দিয়ে শেষ করি। তার ভাষায় “সহানুভূতি আমাদের সময়ের কাংখিত মৌলবাদ”। ক্রমশ যান্ত্রিক হয়ে ওঠা স্বাস্থ্যসেবা দান ব্যবস্থার ভিতরে অসহায় রোগীর জন্য সহানুভূতির ছিটেফোঁটা শান্তির পরশ ধরে রাখতে হলে আমাদের এখনই মৌলিক পদক্ষেপ নিতে হবে। তাহলে চিকিৎসক নিজেও বলতে পারবেন, “ক্লান্তি মোরে ক্ষমা করো প্রভু”।