শরীর ও মন নিয়ে লেখালেখি

Friday, 4 April 2014

দুশ্চিন্তানাশক এবং নিদ্রাকর্ষক ওষুধ নিয়ে নতুন দুশ্চিন্তা

দুশ্চিন্তা কমানোর ওষুধ এবং ঘুমের ওষুধ সেবন করা নিয়ে বড়ই দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছে।  এখন জানা যাচ্ছে এধরনের ওষুধ সেবন করলে অকাল মৃত্যুর হার বেড়ে যায়।
এক লাখেরও বেশী মানুষের ওপর ৭ বছর পর্যবেক্ষণের পর বলা হয়েছে যে দুশ্চিন্তা নাশক ওষুধ সেবন করলে অকাল মৃত্যুর হার সাধারনের চেয়ে তিন গুণ বেড়ে যায়। বেনজোডায়াজেপিন জাতীয় ঘুমের ওষুধ এবং তিনটি  "Z drugs" – zaleplon, zolpidem, and zopiclone–এর ক্ষেত্রে ওষুধের মাত্রার সঙ্গে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার সম্পর্ক রয়েছে। এর অর্থ দুশ্চিন্তানাশক এবং ঘুমের ওষুধ সেবন করতে হলে যথেষ্ট সতর্ক থাকতে হবে এবং উপযুক্ত চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া কখনই এধরনের ওষুধ গ্রহণ করা উচিৎ নয়।
শুধুমাত্র ব্রিটেনেই ২০১১-২০১২ সালে এক কোটি ষাট লাখেরও বেশী প্রেসক্রিপশনে দুশ্চিন্তানাশক ও ঘুমের ওষুধ লেখা হয়েছে। এর মধ্যে প্রতি দশটি প্রেসক্রিপশনের ছয়টিতে বেনজডায়াজেপিন এবং প্রতি দশটি প্রেসক্রিপশনের তিনটিতে জেড ড্রাগস লেখা হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশী লেখা হয়েছে ডায়াজিপাম (৪৮%)। এরপরই রয়েছে টেমাজিপাম(৩৫%) এবং জোপিক্লোন(৩৪%)। অনেক রোগী এ জাতীয় একাধিক ওষুধ সেবন করে থাকেন। পর্যবেক্ষণের মূল ফলাফলে দেখা যায় যারা ঘুমের ওষুধ কিংবা দুশ্চিন্তা কমানোর ওষুধ সেবন করেন তাদের মৃত্যুহার সাধারণ মানুষের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ বেশী। এদের অনেকেই  ধূমপান করেন, দুশ্চিন্তা কিংবা মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত, ইনসমনিয়ায় ভুগছেন এবং অন্যান্য জটিল রোগে আক্রান্ত। এসকল ঝুঁকি বিবেচনা করার পরেও ওষুধ গ্রহণের ঝুঁকি রয়ে যাচ্ছে। এটি মূলত পর্যবেক্ষণমূলক গবেষণা হওয়াই এই ফলাফলকে অনেকেই মেনে নিতে পারছেন না। কিন্তু এরচেয়ে নির্ভরযোগ্য এবং বড় পর্যবেক্ষণ ছাড়া এটাকে অস্বীকারও করা  যাচ্ছে না। অতএব সাধারণ মানুষের জন্য একটিই বার্তা; আর তা হচ্ছে বিনা  প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দুশ্চিন্তা কমানোর ওষুধ সেবন না করাই উত্তম।  


তথ্যসূত্রঃ Weich S ,Pearce HL ,Croft P ,Singh S ,Crome I ,Bashford J ,et al. Effect of anxiolytic and hypnotic drug prescriptions on mortality hazards: retrospective cohort study. BMJ 2014; 348:g1996

বিবাহিতদের স্ট্রোক এবং হৃদরোগ কম হয়।

আমরা সব সময় শুনি, বিয়ে হচ্ছে দিল্লী কা লাড্ডু ; যে খায় সে পস্তায় যে না খায় সেওকিন্তু এখন মনে হয় বিবাহিতরা আনন্দিত বোধ করতে পারেসাম্প্রতিক একটি পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে বিবাহিত দম্পতিদের স্ট্রোক এবং হৃদরোগ কম হয়। কিন্তু যারা একা থাকেন কিংবা বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটিয়েছেন তাদের বেশী স্ট্রোক এবং হৃদরোগ হয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৩৫ লাখ মানুষের ওপর পর্যবেক্ষণ করে গবেষকগণ এই পুরনো কথাটি আবার নতুন করে বললেন। এর আগেও বিবাহিত এবং অবিবাহিতদের মধ্যে স্ট্রোক এবং হৃদরোগের পার্থক্য নিয়ে অনেকেই গবেষণা করেছেন। কিন্তু এত বিপুল সংখ্যক মানুষের ওপরে আগে কখনও পর্যবেক্ষণ করা হয়নি। ২০১৪ সালের আমেরিকান কলেজ অব কার্ডিওলজির বৈজ্ঞানিক অধিবেশনে এই ফলাফল জানানো হয়েছে। পর্যবেক্ষণকৃত অংশগ্রহণকারীদের ৬৯ শতাংশ বিবাহিত, ১৩ শতাংশ বিধবা, ৯ শতাংশ তালাক প্রাপ্ত এবং ৮ শতাংশ একা থাকেন।
সার্বিক ফলাফলে দেখা যাচ্ছে বিবাহিতদের মধ্যে করোনারী হৃদরোগ, স্ট্রোক, অ্যাওর্টিক অ্যানিউরিজম এবং অন্যান্য রক্ত নালীর রোগ কম হয়ে থাকে। গবেষকগণ বলছেন বিবাহিত দম্পতিদের সবরকমের রোগই আসলে অবিবাহিতদের চেয়ে কম হয়। কিন্তু বিবাহবিচ্ছেদ, বিধবা কিংবা বিপত্নীক হলে সবরকম রোগের প্রকোপই বেড়ে যায়। আমরা হৃদরোগের ঝুঁকি বিচার করার জন্য প্রচলিত ঝুঁকি সমূহ (যেমনঃ উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল, ধূমপান ইত্যাদি) নিয়ে বেশী চিন্তা করি। এই গবেষণার ফলাফল মানসিক উপাদানসমূহের গুরুত্ব পুনরায় তুলে ধরল। বিষণ্ণতা, শত্রুতাপূর্ণ মনোভাব, অতিরিক্ত মানসিক চাপ এবং সামাজিক সমর্থন- এধরণের বিষয়গুলো সম্পর্কেও আমাদের খেয়াল রাখতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে বিয়ে করলে উপকার কি? এর সরাসরি কোন উত্তর না পাওয়া গেলেও মনে করা হচ্ছে, বিবাহিতরা খাওয়া দাওয়া এবং শরীর চর্চার ব্যাপারে যত্নশীল থাকেন, অসুখ-বিসুখ হলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন এবং ওষুধ সেবনের বিষয়ে দম্পতিরা বেশী সচেতন থাকেন। বিবাহিত দম্পতিদের রক্তনালীতে প্রদাহের পরিমাণ কম থাকে। কেন কম থাকে তা জানা না গেলেও, এ কারণেও বিবাহিতদের স্ট্রোক এবং হৃদরোগ কম হয়ে থাকতে পারে।



পুরুষের যৌন দুর্বলতা এবং স্ট্যাটিনজাতীয় কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ



কোলেস্টেরল কমানোর স্ট্যাটিনজাতীয় ওষুধ আজকাল অনেক পরিচিত পুরুষের  ইরেকটাইল ডিসফাংশন(erectile dysfunction) বা লিঙ্গ উত্থানের সমস্যা কমানোর ক্ষেত্রে স্ট্যাটিনজাতীয় ওষুধ বিশেষ ভূমিকা রয়েছেআমেরিকান কলেজ অব কার্ডিওলজির ২০১৪ সালের বার্ষিক বৈজ্ঞানিক অধিবেশনে  স্ট্যাটিনজাতীয় কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ সম্পর্কে এই চমকপ্রদ তথ্য জানানো হয়েছে এবং একটি অনলাইন জার্নালেও এটা প্রকাশিত হয়েছে
৪০ বছরের বেশী বয়সী পুরুষদের প্রায় ২০ থেকে ৪০ শতাংশ কোন না কোন পর্যায়ে ইরেকটাইল ডিসফাংশনে ভুগে থাকেন শারীরিক কিংবা মানসিক উভয় কারণেই ইরেকটাইল ডিসফাংশন হতে পারে ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ, রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশী হলে, অতিরিক্ত ধূমপান করলে কিংবা অতিরিক্ত মেদভুঁড়ি হলে ইরেকটাইল ডিসফাংশনের সমস্যা দেখা দেয় মানসিক কারণেও অনেকের ইরেকটাইল ডিসফাংশন দেখা দিতে পারে অতিরিক্ত মানসিক চাপ, বিষণ্ণতা, কর্মক্ষেত্রে জটিলতা, আর্থিক সমস্যা, দাম্পত্য কলহ ইত্যাদি কারণে এটা ঘটে থাকে
ইরেকটাইল ডিসফাংশনের চিকিৎসা নির্ভর করে রোগের কারণের উপর পুরুষাঙ্গের উত্থানের সমস্যা যদি কোনো নির্দিষ্ট রোগের কারনে হয় তা হলে অবশ্যই সে রোগের চিকিৎসা করাতে হবে। সচরাচর এই রোগের জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়া  কিছু ওষুধ ব্যবহৃত হয়যেমনঃ সিলডেনাফিল (sildenafil)এটা অনেকের নিকট ভায়াগ্রা নামে পরিচিত। অনেকক্ষেত্রে অ্যানড্রোজেন জাতীয় হরমোন  প্রয়োগ করা হয়লিংগে ইনজেকশন কিংবা  অপারেশনের মাধ্যমে পুরুষাঙ্গে বিভিন্ন ধরনের প্রসথেসিস স্থাপন করেও এর চিকিৎসা করা হয়। কিন্তু এর চিকিৎসায় স্ট্যাটিনজাতীয় কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ ব্যবহারের বিষয়টি একেবারেই নতুন।
বর্তমান পর্যবেক্ষণের ফলাফলে যা পাওয়া যাচ্ছে তার সারমর্ম হলঃ 
·         কোলেস্টেরল কমানোর স্ট্যাটিনজাতীয় ওষুধ পুরুষের ইরেকটাইল ডিসফাংশন ২৫ শতাংশ কমাতে সক্ষম।
·         স্ট্যাটিন ভায়াগ্রার মতো কার্যকরী নয়। তবে এটা ভায়াগ্রার কাজ অন্তত অর্ধেক করতে সক্ষম।
·         স্ট্যাটিন রক্তনালীকে প্রসারিত করে লিঙ্গে সুষ্ঠুভাবে রক্ত সঞ্চালনে সাহায্য করে
·         গবেষকদের ধারণা স্ট্যাটিনজাতীয় কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ ব্যবহার করার ব্যাপারে এখন পুরুষেরা অধিক আগ্রহী হবেন।  
আগেই বলা হয়েছে বয়স্কদের অনেকেরই ইরেকটাইল ডিসফাংশন রয়েছে। বয়স হলে হৃদরোগের প্রকোপ যেমন বাড়ে; তেমন ইরেকটাইল ডিসফাংশনের প্রকোপও বেড়ে যায়। এখন বলা হচ্ছে কারও ইরেকটাইল ডিসফাংশনের লক্ষণ প্রকাশ পেলে তার হৃদরোগের জন্য পরীক্ষা নিরীক্ষা করানো উচিৎ। কারণ দুটোই আসলে রক্তনালীর সমস্যা। অনেক সময় কারও করোনারি হৃদরোগ প্রকাশ পাওয়ার আগেই ইরেকটাইল ডিসফাংশনের লক্ষণ দেখা যায়। করোনারি হৃদরোগীদের রক্তের কোলেস্টেরল কমানোর জন্য স্ট্যাটিনজাতীয় ওষুধ প্রচুর ব্যবহার করা হয়। এর আগের কয়েকটি পর্যবেক্ষণে দেখা গিয়েছিল স্ট্যাটিন সেবন করলে পুরুষের টেস্টোস্টেরন হরমোন কমে যায়। এজন্য অনেকে এটার ব্যবহার নিয়ে দ্বিধান্বিত ছিলেন।  কিন্তু এখন বড় ধরণের মেটাঅ্যানালিসিসের ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে আসলে স্ট্যাটিন পুরুষের ইরেকটাইল ডিসফাংশনের লক্ষণ উপশমের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখে।  সার্বিকভাবে বলা যায় স্ট্যাটিনজাতীয় কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ পুরুষের ইরেকটাইল ডিসফাংশন ২৫ শতাংশ কমাতে সক্ষম। ভায়াগ্রা ব্যবহার করলে যে উপকার হয় এটা তার সমতুল্য না হলেও, একেবারে কমও নয়। স্ট্যাটিন ভায়াগ্রার অন্তত ৫০ শতাংশ কাজ করতে সক্ষম। এখনই ইরেকটাইল ডিসফাংশনের চিকিৎসার জন্য  কাউকে স্ট্যাটিনজাতীয় কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ সেবন করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে না।তবে যাদের হৃদরোগের পাশাপাশি ইরেকটাইল ডিসফাংশন আছে, তারা যদি  স্ট্যাটিনজাতীয় কোলেস্টেরল কমানোর ওষুধ খেয়ে কিছু উপকার পায় তো ক্ষতি কি? রথ দেখা হল, কলাও বেচা হল।


তথ্যসূত্রঃ Kostis JB, Dobrzynski JM. The Effect of Statins on Erectile Dysfunction: A Meta-Analysis of Randomized Trials. The Journal of Sexual Medicine. 2014 Mar 29. PubMed PMID: 24684744. Epub 2014/04/02. Eng.

Friday, 28 February 2014

যত বেশী উদ্বেগ, তত বেশী মাথাব্যথা

যাদের মাথাব্যথা হয় তাদের কাছে এটা নতুন বিষয় নয়। যত বেশী উদ্বেগ-দুশ্চিন্তা, তত বেশী মাথাব্যথা। জার্মানির একদল গবেষক মাথাব্যথার সঙ্গে উদ্বেগের সম্পর্ক নিয়ে পর্যবেক্ষণের ফলাফলে এমন তথ্যই পেয়েছেন। বলা হচ্ছে উদ্বেগ মাথাব্যথা শুরু হওয়ার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এবং অব্যহত উদ্বেগের মধ্যে জীবনযাপন করলে অনেকরই ক্রনিক মাথাব্যথার সমস্যা সৃষ্টি হয়।

 পরবর্তীতে মাথাব্যথা নিজেই একটি উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। গত ২০১০ থেকে ২০১২ পর্যন্ত ২১ থেকে ৭৫ বছর বয়সী পাঁচ হাজারের বেশী মানুষের ওপর পর্যবেক্ষণ করে জার্মান গবেষকগণ ৩১ শতাংশ টেনশনজনিত মাথাব্যথা এবং ১৪ শতাংশ মাইগ্রেনজনিত মাথা ব্যথা পেয়েছেন। ১১ শতাংশ ক্ষেত্রে উভয় ধরণের সংমিশ্রণজনিত মাথাব্যথা আর ১৭ শতাংশ ক্ষেত্রে কোন কারণ নির্ধারণ করা হয়নি।তবে সব ধরণের মাথাব্যথার ক্ষেত্রেই উদ্বেগের পরিমাণ বাড়লে প্রতি মাসে মাথাব্যথার হার বাড়ার নজির পাওয়া গিয়েছে।

অতএব মাথাব্যথা নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে উদ্বেগ মোকাবেলা করার ভালো ব্যবস্থা দরকার। গবেষকগণ মনে করেন এজন্য শরীর এবং মন – দুটোরই চিকিৎসা দরকার। জার্মানদের পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে ধ্যান, যোগ ব্যায়াম, তাইচি, বায়ো ফিডব্যাক, শিথিলায়ন ইত্যাদি প্রক্রিয়ার সাহায্যে ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ ক্ষেত্রে মাথা ব্যথা কমানো সম্ভব। 

 তথ্যসূত্রঃ 66th Annual Meeting of the American Academy of Neurology (AAN), April 26 to May 3, 2014. Abstract 344.


Sunday, 23 February 2014

সিজারিয়ান অপারেশনের নতুন নীতিমালা

সিজারিয়ান অপারেশনের বিপক্ষে মতামত দিন দিন জোরালো হয়ে উঠছে বলে মনে হচ্ছে। সম্প্রতি ধাত্রী ও স্ত্রী রোগ বিদ্যা বিষয়ক আমেরিকান কলেজ (ACOG) এ বিষয়ে নতুন নীতিমালা প্রকাশ করেছে। সেখানে অযথা কিংবা প্রয়োজন না থাকলে সিজারিয়ান অপারেশন করে সন্তান জন্ম দেওয়াকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।
বলা হচ্ছে সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার প্রক্রিয়াটি আসলে আমরা এতদিন যত দ্রুত হয় বলে মনে করে এসেছি, সেটা তারচেয়ে শ্লথ গতিতেও হতে পারে। এ জন্য তাড়াহুড়ো করে সিজারিয়ান অপারেশন করা কতটুকু দরকারী তা নিয়ে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিৎ। কারণ প্রথম সন্তান জন্মদানের সময় সিজারিয়ান অপারেশন করা হলে, পরবর্তী সন্তান জন্মদানের সময়ও সাধারনত সিজারিয়ান করা লাগে। প্রথম সিজারিয়ান এড়ানো গেলে পরবর্তী সিজারিয়ান অপারেশনও এড়ানো সম্ভব হয়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ২০১১ সালে প্রতি তিনজনের মধ্যে দুইজন গর্ভবতী মায়ের সিজারিয়ান অপারেশন করে সন্তান জন্ম দেওয়া হয়েছে। অনেকেই এটা স্বাভাবিকভাবে নিতে পারছেন না। এক হিসেবে দেখা যাচ্ছে ১৯৯৬ সালের তুলনায় সিজারিয়ান অপারেশনের হার ৬০ শতাংশ বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে শিশু এবং মায়ের জীবন রক্ষা করার জন্য সিজারিয়ান অপারেশন করা জরুরী হয়ে পড়ে; কিন্তু ইতোমধ্যে মহিলাদের এমন কি পরিবর্তন ঘটেছে যে তাদের এমন ব্যাপকভাবে সিজারিয়ান অপারেশন করে সন্তান জন্ম দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিচ্ছে? নীতি নির্ধারকগণ অতিরিক্ত সিজারিয়ান অপারেশন করাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা পদ্ধতির অপব্যবহার হিসেবে গণ্য করছেন। তাছাড়া সিজারিয়ান অপারেশন করলে এরও কিছু স্বল্প মেয়াদী এবং দীর্ঘ মেয়াদী ঝুঁকি এবং প্রতিক্রিয়া রয়েছে। অপারেশনের নিজস্ব ঝুঁকি ছাড়াও শিশু এবং মায়ের ওপরে এর পরবর্তী দীর্ঘমেয়াদী প্রতিক্রিয়া নিয়ে অনেক গবেষক এখন শঙ্কিত।  এজন্য সাম্প্রতিক নীতিমালায় স্ত্রী রোগ ও ধাত্রী বিশেষজ্ঞদের জন্য কতগুলি নির্দেশনা উল্লেখ করা হয়েছে।

তথ্যসূত্রঃ Obstetric Care Consensus No. 1: Safe Prevention of the Primary Cesarean Delivery. Obstetrics & Gynecology. 123(3):693-711, March 2014.

Tuesday, 11 February 2014

বাড়ীতে দই বানানোর দুটি সহজ রেসিপি

আমাদের সকলের দধিপ্রীতি পুরনো । দই খুব ভাল খাবার যদি খাঁটি দুধকে গাজিয়ে (ফারমেন্টেড) দই করা হয়। কিন্তু বাজারে যেসব দই  পাওয়া যায়, তা কতটুকু খাওয়ার উপযোগী গবেষণাগারে নিয়ে দেখা দরকার। বেশিরভাগই অখাদ্য, নয় কুখাদ্য। দই তৈরীতে আটা, ময়দা, বাটারওয়েল, টিস্যু পেপার, রং, সেন্ট, কলা, কতকিছু যে মিশায় হয়তো কখনও মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থাও হবে।
তবে আপাতত অপেক্ষা না করে আমরা স্বনির্ভর হতে পারি। কারণ দই বানানো খুবই সহজ এবং মজাদার কাজ। দোকানের দই না খেয়ে বাড়ীতে নিজে দই বানিয়ে খাওয়ার আনন্দই আলাদা। এজন্য সহজ দুটো দইয়ের রেসিপিঃ
১। সাধারণ সাদা টক দই
বাসায় সাদা টক দই বানানো খুবই সহজ। এরজন্য প্রয়োজন এক লিটার গরুর দুধ (ছাগী, মহিষ কিংবা উটের দুধও ব্যবহার করা যায়। এছাড়া সয়া দুধ কিংবা নারকেলের দুধ দিয়েও দই বানানো যায়) এবং  দইয়ের সাঁজ দুই টেবিল চামচ প্রথমে দুধ ফুটিয়ে ঘন করে নিতে হবেএক লিটার দুধ আধা লিটার পরিমাণ ঘন হয়ে এলে নামিয়ে গরম দুধ ভালো করে ফেটে নিতে হবে ফেনা উঠে গেলে দইয়ের সাঁজ গলিয়ে কুসুম গরম ফেটানো দুধের সঙ্গে মিশিয়ে দিতে হবে। দই বসানোর পাত্রটি  ঢাকনা দিয়ে গরম জায়গায় রাখতে হবে। কোনরকম নাড়াচাড়া না করে পাত্রটি পাঁচ-ছয় ঘণ্টা রেখে দিলে দই জমে যাবে।
২। মাইক্রোওয়েভ ওভেনে বানানো টক দই
আমরা সবাই ব্যস্ত থাকি। তাই ঘটা করে দুধ জ্বাল দিয়ে দই বানানো আমাদের হয়ে ওঠে না।  কিন্তু বাসায় সহজে খুব অল্প পরিশ্রমে মাইক্রোওয়েভ ওভেনে সাদা টক দই বানানো যায়। এর জন্য দুধ লিটার দুধ আর ২ টেবিল চামচ দইয়ের বীজ (আগের দই) বা সাঁজ লাগবে।
সবচেয়ে ভালো হয় রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগে একটি বড় কাঁচের বাটি কিংবা পাত্রে দুধ নিয়ে মাইক্রোওয়েভ ওভেনে ৮ মিনিট গরম করতে হবে। সাধারণত এই সময়ের মধ্যেই দুধের বলক উঠে  যায়। যদি তা না হয়, সেক্ষেত্রে আরও দুই মিনিট গরম করতে হবে। বাটি কিংবা কাঁচের পাত্রটি এমন আকারের হতে হবে যেন দুধ উথলে উঠলে উপচে পড়ে না যায়। এরপর দুধ একটু শীতল হয়ে আসলে দইয়ের বীজ বা পুরনো দই দুধের মধ্যে ঢেলে মিশিয়ে দিতে হবে। পাত্রটিকে মাইক্রোওয়েভ ওভেনের ভিতরেই একটি ছোট তোয়ালে  দিয়ে ঢেকে সারা রাত রেখে দিতে হবে।পরদিন মাইক্রওয়েভ ওভেনে সকালের নাস্তা তৈরি করার আগেই পাওয়া যাবে নিজের বানানো সাদা টক দই। কেউ মিষ্টি দই খেতে চাইলে দুধ ফোটানোর আগেই প্রয়োজনমতো চিনি কিংবা গুড় মিশিয়ে নিতে হবে।

তবে নিঃসন্দেহে টক দই বেশী স্বাস্থ্যকর। নিজে দই বানান, নিজে খান এবং অন্যকেও খেতে দিন। 

মেয়েদের বয়ঃসন্ধিক্ষণ কি এগিয়ে আসছে?

মেয়েদের পিউবার্টি (Puberty) আজকাল আগেই শুরু হচ্ছে ছেলেমেয়েদের বয়ঃসন্ধিকালকে ইংরেজীতে পিউবার্টি বলে এটা এমন এক প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে একটি শিশু শরীর প্রাপ্তবয়স্ক শরীরে রূপান্তরিত হয় ইদানীং অগ্রিম পিউবার্টির সঙ্গে মোটা হয়ে যাওয়ার একটি সম্পর্ক দেখা যাচ্ছে ১৯৭০ সালে মার্শাল এবং ট্যানার এটা নিয়ে একটি বৈজ্ঞানিক রিপোর্ট প্রকাশ করেছিলেন মেয়েদের শরীরের বাড়ন নিয়ে এই প্রতিবেদন ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য মাইল ফলক
অনেকের মনে প্রশ্ন আছে মেয়েদের স্বাভাবিক শারীরিক বাড়ন কেমন হওয়া উচিত? এদিক দিয়ে ছেলেদের চেয়ে মেয়েরা বরাবরই এগিয়ে সচরাচর মেয়েদের পিউবার্টি থেকে ১২ বছরের মধ্যে আসে আর ছেলেদের আসে থেকে ১৪ বছরের মধ্যে পিউবার্টি পূর্ণ হতে গড়পড়তা মেয়েদের বছর এবং ছেলেদের বছর সময় লাগে
স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে আমরা কিভাবে বুঝবো পিউবার্টি শুরু হয়েছে? ব্রিটিশ শিশু বিশেষজ্ঞ ট্যানারের বিবরন অনুসারে মূলত তিনটি ক্ষেত্রে এর লক্ষণ প্রকাশ পায় মেয়েদের ক্ষেত্রে প্রথম হচ্ছে স্তন বৃদ্ধি আর ছেলেদের ক্ষেত্রে অণ্ডকোষ বড় হওয়া ছেলেমেয়ে উভয়ের ক্ষেত্রে শ্রোণীদেশে যৌনকেশ গজানো পিউবার্টির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ তৃতীয়ত রয়েছে গলার স্বর পরিবর্তন, মুখে দাঁড়ি-গোঁফ ওঠা , লম্বায় বড় হওয়া এবং মেয়েদের মাসিক রজঃস্রাব শুরু হওয়া এক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি সুনির্দিষ্ট পরিমাপ রয়েছে ছেলেদের অণ্ডকোষ মিলিলিটারের বড় হলেই ধরে নেওয়া হয় যে তার পিউবার্টি শুরু হয়েছে অণ্ডকোষের মাপ ২০ মিলিলিটার এবং লিঙ্গ ১৫ সেন্টিমিটার (. ইঞ্চি) লম্বা হলে পিউবার্টির সমাপ্তি গণনা করা হয়
নতুন পর্যবেক্ষণসমূহে কি দেখা যাচ্ছে? মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১২০০ মেয়ের ওপর পরিচালিত জরীপে মূলত স্তন বিকাশের ওপরই বেশী গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে কারণ অন্যান্য পর্যবেক্ষণেও দেখা যায় মাসিক রজঃস্রাব শুরুর বয়স অপরিবর্তিত রয়েছে কিন্তু স্তনবৃন্তের  বিকাশ ১৯৯০-এর দশকে যা হতো, এখন তার চেয়ে কয়েক মাস  আগে ঘটছে
আরও দূর অতীতে ফিরে গেলে অবশ্য পরিবর্তনটি চোখে পড়ার মতো বিভিন্ন হিসেব থেকে দেখা যায় ১৮৬০ সালে মেয়েদের পিউবার্টির গড় বয়স ছিল ১৬. বছর ১৯২০ সালে এটা ছিল ১৪. বছর; ১৯৫০ সালে ১৩. বছর; ১৯৮০ সালে ১২. বছর আর ২০১০ সালে এটা নেমে এসেছে ১০. বছরে ছেলেদের বেলাতেও একই রকম পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে তবে তাদের ক্ষেত্রে সবকিছুতে এখনো বছর বেশী সময় লাগে আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে বর্তমান পর্যবেক্ষণের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে আফ্রিকান আমেরিকান মেয়েদের পিউবার্টি আসছে বছর ১০ মাসে; সাদা এবং এশিয়ান মেয়েদের বছর মাসে আর স্প্যানিশ মেয়েদের বছর ৪ মাসে  এই পার্থক্যকে বিজ্ঞানীরা গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন; কারণ সারা দুনিয়ার মেয়েদের পিউবার্টি সম্পর্কে আসলে তেমন নির্ভরযোগ্য তথ্য নেই
পরিবর্তন শুধু মেয়েদের ক্ষেত্রেই ঘটছে না গত বছর আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব পেডিয়াট্রিক্স মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৪১ টি অঙ্গরাজ্যের ৪০০০ বালকের ওপর করেছিল সে পর্যবেক্ষণের ফলাফলেও দেখা যায় ছেলেদের পিউবার্টি ১০ বছর বয়সে শুরু হচ্ছে অতীতে এটা সাড়ে এগার বছর বয়স থেকে শুরু হতো ছেলেমেয়ে উভয়ের জন্যই এর কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে অতিরিক্ত পুষ্টিকর খাদ্য গ্রহণ এবং শরীরচর্চা
অন্যান্য দেশে কি হচ্ছে? বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিকট বিভিন্ন দেশের ছেলেমেয়েদের পিউবার্টি সংক্রান্ত তথ্য তেমন নেই তবে বিভিন্ন সূত্র থেকে প্রাপ্ত তথ্যে প্রমাণিত হচ্ছে দেশে দেশে পার্থক্য থাকলেও সারা ইউরোপ জুড়েও ছেলেমেয়েদের পিউবার্টি আগে আসছে

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে ছেলেমেয়েদের পিউবার্টি এত কম বয়সে কেন শুরু হচ্ছে? গবেষণায় অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিএমআই (body mass index)-কে দায়ী করা হচ্ছে কারো শরীরের ওজন বেশী না কম সেটা প্রকাশ করার জন্য বিএমআই ব্যবহার করা হয় বিএমআই যত বেশী, সে তত ওজনে বেশী কিংবা মোটা কিন্তু এক্ষেত্রে কি শুধু মেদবহুল বা মোটা হওয়ার সঙ্গেই এর সম্পর্ক? নাকি আরও কোন রহস্য রয়েছে  উদাহরণস্বরূপ ডেনমার্কে দত্তক নেওয়া শিশুদের ওপর এক পর্যবেক্ষণের ফলাফলে একটি মজার বিষয় দেখা গিয়েছে উন্নয়নশীল দেশ থেকে দত্তক নেওয়া মেয়েদের পিউবার্টি অনেক আগে শুরু হয় কিন্তু উন্নত দেশ থেকে দত্তক নেওয়া মেয়েদের পিউবার্টি পরে শুরু হয় এটাকে শুধু পুষ্টি, ওজন কিংবা শরীরে চর্বির পরিমাণ দিয়ে মেলান যাচ্ছে না সুইডেন, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, সুইজারল্যান্ড এবং যুক্তরাষ্ট্রে মাইগ্রেট করে যাওয়া মেয়েদের ক্ষেত্রেও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে এজন্য অনেকে শিশুর চারপাশের পরিবেশমানসিক চাপ , আবহাওয়া , দিনের আলোর পরিমাণ,পরিবেশ এবং খাবার-দাবারে রাসায়নিক উপাদানের উপস্থিতি ইত্যাদি বিষয়গুলি ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকগণ বলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে অগ্রিম পিউবার্টির কোন কারণ শনাক্ত করা যায় না অনেকের ক্ষেত্রে সুষম পুষ্টির কারণে ওজন বেড়ে যাওয়ার ফলে এটা হতে পারে; তবে থ্যালেট এবং হরমোন চক্রকে প্রভাবিত করে এমন রাসায়নিক উপাদানের কারণে এমনটি ঘটে থাকতে পারে কিন্তু এটা নিয়ে সকলে এত আগ্রহী কেন? কারণ অগ্রিম পিউবার্টি স্তন ক্যান্সারের জন্যও একটি ঝুঁকি