শরীর ও মন নিয়ে লেখালেখি

Friday, 5 February 2016

মহিলাদের হার্ট অ্যাটাকের ওপর আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রথম বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদন

বিখ্যাত টাইটানিক ছবির একটি ডায়ালগ ছিল “মেয়েদের হৃদয় গোপন রহস্যের মহাসাগর”(A woman's heart is a deep ocean of secrets) । কিন্তু  আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন তা উম্মোচন করতে চায়; অন্তত হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রে।

সম্প্রতি মহিলাদের হার্ট অ্যাটাকের ওপর প্রথম বৈজ্ঞানিক প্রতিবেদনে তারা বলেছেন যে, পুরুষদের হার্ট অ্যাটাকের চেয়ে মেয়েদের হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ-উপসর্গ একটু ভিন্ন ধরণের। আর সেজন্যই মেয়েদের হার্ট অ্যাটাক শনাক্ত হতে বিলম্ব হয় এবং তারা যথাযথ চিকিৎসা থেকেও অনেক সময় বঞ্চিত থাকছেন।  
হার্ট অ্যাটাক নারীপুরুষ উভয়ের জন্যই ঘাতক ব্যাধি। কিন্তু মেয়েদের করোনারি অ্যাঞ্জিওগ্রামের হার তুলনামূলকভাবে কম। অথচ বর্তমান সময়ে পুরুষের চেয়ে হার্ট অ্যাটাকের কারণে মহিলাদের মৃত্যু হার বেশী। আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশনের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মনে করছেন, এরজন্য রোগী, রোগীর স্বজন এবং চিকিৎসক সকলেরই দৃষ্টিভঙ্গী বদলাতে হবে। কারণ একজন পুরুষের বুকে ব্যাথা হলে যত সহজে তার জন্য হার্ট অ্যাটাকের পরীক্ষানিরীক্ষা করা হয়; একজন মহিলার একই ধরণের বুকে ব্যাথার জন্য তা করা হয় না। কিন্তু তারা এখন মহিলাদের বুকে ব্যাথার বিষয়ে আর যত্নশীল হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন।

একথা স্বীকার করতেই হবে যে, হার্ট অ্যাটাক সম্পর্কে জনগণের সচেতনতা এখন আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। আগে হার্ট অ্যাটাকে মেয়েদের চেয়ে ছেলেদের মৃত্যুহার বেশী ছিল। কিন্তু ইদানীং তা বদলে গিয়েছে। এখন হার্ট অ্যাটাকে পুরুষের চেয়ে মহিলাদের বেশী মৃত্যু হচ্ছে। প্রতি বছর আমেরিকায় ৬৬ লাখ মহিলা হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে থাকেন। কিন্তু এদের অনেকেরই রোগ শনাক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা হয় না এবং তারা চিকিৎসা বঞ্চিত থাকেন।জীবনে প্রথমবার হার্ট অ্যাটাকের পরে একবছরের মধ্যে ১৯% পুরুষের মৃত্যু হয়; কিন্তু সেখানে মহিলাদের মৃত্যু হার ২৬%। হার্ট অ্যাটাকের ৫ বছরের মধ্যে ৩৬% পুরুষ রোগী মারা যায়। কিন্তু মহিলাদের মৃত্যু হার ৪৭%।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে পুরুষদের চেয়ে আসলে মহিলাদের ডায়াবেটিস, হার্ট ফেইলিউর, উচ্চ রক্তচাপ, বিষণ্ণতা এবং কিডনির সমস্যা বেশী হয়ে থাকে। আর মহিলাদের হার্ট অ্যাটাক হলেও ইসিজিতে তা ধরা পড়ে না। এজন্য তাদের হার্ট অ্যাটাক সন্দেহ করলে তা অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হবে।

ঘটনা এখানেই শেষ নয়।মহিলাদের হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসার পরে জটিলতাও বেশী হয়। তাদের রক্ত ক্ষরণের প্রবণতা বেশী, দীর্ঘদিন হাসপাতালে থাকার প্রয়োজন হয় এবং করোনারি বাইপাস করার পরে মৃত্যুহারও বেশী। ৫০ বছরের বেশী বয়সী মহিলাদের হৃদরোগ শনাক্ত হওয়ার হার সন্তোষজনক হলেও কমবয়সী মহিলাদের হৃদরোগ কম শনাক্ত হচ্ছে।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কমবয়সী মহিলাদের হৃদরোগ কেন বেশী হচ্ছে? এর উত্তর আসলে এখনও পরিস্কার নয়। রজনিবৃত্তির পরে একজন বয়সী মহিলার হৃদরোগ হওয়ার কারন বোধগম্য। রজনিবৃত্তির পরে মেয়েদের ইস্ট্রোজেন হরমোন কমে যাওয়ার ফলেই এতসব বিপত্তি হয় বলে মনে করা হয়। কিন্তু হৃদরোগ প্রতিরোধে হরমোন চিকিৎসা তেমন আশাব্যঞ্জক ফলাফল দেয়নি।

তবে প্রতিবেদনে মহিলাদের হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ-উপসর্গ যে পুরুষদের হৃদরোগের চেয়ে আলাদা হতে পারে, সে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে তুলে ধরা হয়েছে এবং বলা হয়েছে সমাজের আরও অন্যান্য অনেক ক্ষেত্রে বঞ্চণা এবং অবহেলার মতো হার্ট অ্যাটাকের বেলাতেও মহিলারা বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। তাই সময় এসেছে এ বিষয়ে সচেতন হয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার।
  

তথ্যসূত্রঃ Mehta LS, Beckie TM, DeVon HA, Grines CL, Krumholz HM, Johnson MN, et al. Acute Myocardial Infarction in Women: A Scientific Statement from the American Heart Association. Circulation. 2016. Published online before print January 25, 2016.

বেশী আলু খেলে ডায়াবেটিস

আলু আমাদের অতি পরিচিত খাবার। এটা এক ধরণের কন্দ বা মূল যা সবজি হিসেবে খাওয়া হয়। অনেক রাজা-বাদশাহ ভাতের পরিবর্তে আলু খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন; দিয়ে অনেক সমালোচনার মুখেও পড়েছেন। আমেরিকা-বিলেতে আলু একটি প্রধান খাদ্য। কত উপায়ে যে আলু দিয়ে খাবার তৈরি করা হয়, তার ইয়ত্তা নেই। কিন্তু সম্প্রতি গবেষকগণ আলুর খুব বড় রকমের দোষ খুঁজে পেয়েছেন। দেখা যাচ্ছে, বেশী বেশী আলু খেলে আসলে টাইপ-২ ডায়াবেটিস মেলিটাস হওয়ার হার অনেক বেড়ে যায়।বলাবাহুল্য আলুতে মূলত শর্করা থাকে; সে তুলনায় আঁশ, ভিটামিন এবং খনিজ উপাদানের পরিমাণ খুবই কম। গরম সেদ্ধ, ভর্তা কিংবা ভাজি আলু খুবই সহজপাচ্য এবং অতি সহজেই আলু খাওয়ার পরে রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বেড়ে যায়।

বর্তমান গবেষণায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তিন গ্রুপের প্রায় ২ লাখ নার্স এবং চিকিৎসকদের উপর দীর্ঘদিন পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। শুরুতে এদের কারোই ডায়াবেটিস, হৃদরোগ কিংবা ক্যানসার ছিল না। এদের প্রত্যেকের নিয়মিত আলু খাওয়ার হিসেব করে দেখা যাচ্ছে যারা বেশী আলু সেদ্ধ, ভর্তা, পোড়ান কিংবা আলুর ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খেয়েছেন তাদের ডায়াবেটিস হওয়ার প্রবণতা অনেক বেশী।তবে দেখা যাচ্ছে ফ্রেঞ্চ ফ্রাই খাওয়া বেশী বিপদের। বিভিন্ন রকম আলুর তরকারীর মধ্যে যারা ফ্রেঞ্চ ফ্রাই বেশী খেয়েছেন তাদেরই ডায়াবেটিস বেশী হয়েছে। এজন্য গবেষকদের পরামর্শ হচ্ছে, আলুর ব্যাপারে সাবধান।বেশী বেশী আলু খেয়ে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি না বাড়ানোই ভাল।
  

তথ্যসূত্রঃ Muraki I, Rimm EB, Willett WC, Manson JE, Hu FB, Sun Q. Potato Consumption and Risk of Type 2 Diabetes: Results from Three Prospective Cohort Studies. Diabetes Care. 2015. 

Tuesday, 2 February 2016

সুস্থতার জন্য বন্ধুত্ব এবং সোশ্যাল মিডিয়া

গুনীজনেরা বলেন, “স্বাস্থ্য নয়, ব্যাধিই সংক্রামক”।কিন্তু কখনও কখনও স্বাস্থ্যও সংক্রামক হতে পারে। দেখা যাচ্ছে স্বাস্থ্যের ওপর আমাদের বন্ধুদের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। আপনার পাঁচজন প্রিয় বন্ধুর নাম স্মরণ করেন। তারা কি করেন? তারা কি বিকেলে ব্যায়াম করেন? কিংবা খেলাধুলা করেন? তারা কি ধূমপান করতে পছন্দ করেন? তাদের কি মেদভুঁড়ি হয়েছে? এ বিষয়গুলি লক্ষ্য করা জরুরী। কারণ আপনার স্বাস্থ্যের ওপর আপনার বন্ধুদের অভ্যাসের প্রভাব রয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১২,০০০ সদস্যের ওপর ৩২ বছর পর্যবেক্ষণের একটি ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। তাতে দেখা যায় কারও ঘনিষ্ঠ বন্ধু স্থূলকায় হলে, তারও স্থূলকায় হওয়ার সম্ভাবনা ১৭১% বেড়ে যায়। কারও ঘনিষ্ঠ বন্ধু আত্মহত্যা করলে, তার আত্মহত্যা করার সম্ভাবনা ৪ গুণ বেড়ে যায়।

স্বভাবতই প্রশ্ন জাগতে পারে যে বন্ধুদের মাধ্যমে কিংবা সোশ্যাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে যদি রোগব্যাধি ছড়ায়, তাহলে এর মাধ্যমে কি আমাদের স্বাস্থ্যকর অভ্যাসগুলি কি সঞ্চারিত হতে পারে না? এর উত্তর খুবই সহজ। স্বাস্থ্যকর অভ্যাসগুলি সঞ্চারণে সোশ্যাল নেটওয়ার্কের ভূমিকা রয়েছে; কিন্তু রোগব্যাধি ছড়ানোর তুলনায় তা খুবই অকিঞ্চিৎকর। 

দেখা যাচ্ছে সোশ্যাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ধূমপান ছাড়ানোর মতো প্রক্রিয়া বেশ জোরেশোরেই সম্পন্ন হয়। এক বন্ধু ধূমপান ছেড়ে দিলে অপর বন্ধুর তা ছাড়ার সম্ভাবনা ৬৭% বেড়ে যায়। সুখী হওয়ার মতো বিষয়ও সংক্রামক। চারপাশে সুখী ব্যক্তিবর্গদ্বারা বেষ্টিত থাকলে আপনারও সুখী হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশী। আর সুখী বন্ধুটি যদি আপনার দেড় কিলোমিটারের মধ্যে বাস করে তাহলে তো কথাই নেই। আপনারও সুখী হওয়ার সম্ভাবনা ২৫% বেড়ে যাবে। সুখী ভাইবোন কিংবা সুখী দম্পতি হলেও একই কথা। তবে সুখী সহকর্মী থাকলে তেমন কোন প্রভাব পড়ে না। অতএব কর্মস্থলে কে সুখী তা নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলে।

কথায় বলে, “রতনে রতন চেনে”। ভাল অর্থে ধরলে এটা আসলে তেমন একটি বিষয়। কারণ সোশ্যাল নেটওয়ার্কের প্রভাব তৃতীয় মাত্রা পর্যন্ত ছড়াতে দেখা যায়; অর্থাৎ স্বাস্থ্যকর কিংবা অস্বাস্থ্যকর অভ্যাস বন্ধু থেকে বন্ধুর বন্ধু পর্যন্ত বিস্তৃত। কিন্তু বাস্তব জীবনের বন্ধুদের মতো অনলাইন সোশ্যাল নেটওয়ার্কের বন্ধুরাও কি স্বাস্থ্য সচেতনতা বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে? অনেকেরই এ বিষয়ে ইতিবাচক ধারণা রয়েছে। সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে বন্ধুদের মধ্যে ব্যায়াম বা শরীরচর্চা করার ক্ষেত্রে উৎসাহ সৃষ্টিতে খুবই ভাল ফল পাওয়া গিয়েছে। সোশ্যাল মিডিয়ার প্রভাবে সপ্তাহে দুইঘণ্টা পর্যন্ত শরীরচর্চা করতে উদ্বুদ্ধ হওয়ার উদাহরণ রয়েছে। অনেকে অন্যান্য স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক কর্মসূচী নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়াতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন এবং ফলাফলে উৎসাহিত বোধ করছেন।অবশ্য সবধরনের স্বাস্থ্যবার্তার জন্য সোশ্যাল মিডিয়া উপযুক্ত নয়; ক্ষেত্রবিশেষে সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কিন্তু অনলাইন সোশ্যাল মিডিয়ার সক্ষমতা সম্পর্কে কারও সন্দেহ নেই। সামাজিক দায়বদ্ধতার কথা মনে রেখে যথার্থ ভূমিকা পালন করলে অনলাইন সোশ্যাল মিডিয়াসমূহের স্বাস্থ্যক্ষেত্রে বিশাল প্রভাব রাখার ক্ষমতা রয়েছে।

তথ্যসূত্রঃ 
1. Christakis, Nicholas A. and James H. Fowler. 2007. The spread of obesity in a large social network over 32 years. The New England Journal of Medicine 357, no. 4: 370-379
2. Christakis NA, Fowler JH. The Collective Dynamics of Smoking in a Large Social Network. New England Journal of Medicine. 2008;358(21):2249-58. PubMed PMID: 18499567. 
3. Fowler James H, Christakis Nicholas A.  Dynamic spread of happiness in a large social network: longitudinal analysis over 20 years in the Framingham Heart Study BMJ 2008; 337:a2338    

Sunday, 31 January 2016

হেপাটাইটিস বি ভ্যাকসিনের বুস্টারডোজ কি জরুরী?

হেপাটাইটিস বি ভ্যাকসিন নেওয়ার ৩০ বছর পরে বুস্টার ডোজের আর দরকার নেই। দুনিয়াজুড়ে সার্বজনীন টীকা দানের সাফল্য সম্পর্কে আমরা সকলেই জানি।কিন্তু হেপাটাইটিস বি ভ্যাকসিন  দিলে প্রতিরোধ ক্ষমতা কতদিন কার্যকর থাকে সে সম্পর্কে তেমন বিস্তারিত তথ্য জানা যায় না। মূলত এতদিন হেপাটাইটিস বি ভ্যাকসিনের কার্যকারীতা ২২ বছর পর্যন্ত জানা ছিল। সম্প্রতি মার্কিন রোগ প্রতিরোধ কেন্দ্রের গবেষকদল আর্কটিক গবেষণা প্রকল্পের মাধ্যমে আলাস্কার ১৫৭৮ জন অধিবাসীর ওপর ৩০ বছর পর্যবেক্ষণের ফলাফল জানিয়েছেন। ১৯৮১ সালে হেপাটাইটিস বি ভ্যাকসিন শুরু হওয়ার পরেই তাদের টীকা দেওয়া হয়েছিল। এরপর ১১ বছর ধরে প্রতিবছর ধরে হেপাটাইটিস বি ভ্যাকসিনের বিরুদ্ধে কেমন অ্যান্টিবডি তৈরি হচ্ছে তা পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে। পরবর্তীতে ১৫ এবং ২২ বছরের মাথায় আবার তা পরীক্ষা করা হয়েছে। ২২ বছর পরেও ৬০% অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সুরক্ষাকারী মাত্রার অ্যান্টিবডির অস্তিত্ব দেখা গিয়েছে।আর বুস্টার ডোজ যারা নিয়েছেন তাদের হিসেবে ধরলে ৯৩%। কিন্তু কারও নতুন করে হেপাটাইটিস বি ভাইরাস সংক্রমিত হয়নি।নতুন ফলাফলে তাদের মধ্য থেকেই ৪৩৫ জনের রক্ত ৩০ বছর পরে পরীক্ষা করা হয়েছে। সার্বিক বিচারে দেখা যাচ্ছে যাদের প্রাথমিক পর্যায়ে ভ্যাকসিন নেওয়ার পরে যথাযথ অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে ৩০ বছর পরেও তাদের মধ্যে ৯০% টীকা গ্রহণকারীর রক্তে প্রতিরোধ ক্ষমতা যথেষ্ট রয়েছে। এজন্য গবেষকগন মনে করছেন হেপাটাইটিস বি ভ্যাকসিন নেওয়ার অন্তত ৩০ বছর পরেও বুস্টার ডোজ নেওয়ার তেমন কোন গুরুত্ব নেই। উল্লেখ্য ১৯৮২ সাল থেকে হেপাটাইটিস বি ভ্যাকসিন ব্যবহার শুরু হয়েছে। তবে ১৯৯২ সাল থেকে রিকমবিনেন্ট ডিএনএ প্রযুক্তিতে ভ্যাকসিন তৈরি শুরু হয়। ২০১৪ সাল নাগাদ ১৮৪টি দেশের সম্প্রসারিত টীকাদান কর্মসূচীতে হেপাটাইটিস বি ভ্যাকসিন অন্তর্ভুক্ত হয়েছে এবং অন্তত শতকরা ৮২জন শিশুকে এই টীকা দেওয়া হয়েছে।   

তথ্যসূত্রঃ Bruce MG, Bruden D, Hurlburt D, Zanis C, Thompson G, Rea L, et al. Antibody Levels and Protection after Hepatitis B Vaccine: Results of a 30-Year Follow-up Study and Response to a Booster Dose. Journal of Infectious Diseases. January 21, 2016.

Thursday, 21 January 2016

যিকা ভাইরাসঃ নতুন আপদ

দক্ষিণ আমেরিকা, মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জে ব্যাপকভাবে একটি নতুন ভাইরাস সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। এর নাম যিকা ভাইরাস(Zika virus)।আর এটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও ছড়িয়ে পড়বে এমন আশংকায় সকলেই নড়ে-চড়ে বসেছেন। সত্যিকার অর্থে বলতে গেলে, গত দুই দশকে সন্ধিপদ প্রাণীবাহী (arthropod-borne viral diseases)চার ধরণের ভাইরাস অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে এইসকল দেশগুলিতে ছড়িয়ে পড়েছে। যেমনঃ নব্বইয়ের দশকে ডেঙ্গি (dengue), ১৯৯৯-এ ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস(West Nile virus), ২০১৩ সালে চিকুনগুনিয়া ভাইরাস(chikungunya); আর বর্তমান আপদ যিকা ভাইরাস।
যিকা ভাইরাস ১৯৪৭ সালে সর্বপ্রথম শনাক্ত হয়েছিল উগান্ডায়। দীর্ঘদিন যাবত এর অস্তিত্ব শুধুমাত্র আফ্রিকা এবং এশিয়ায় বিষুবরেখার আশেপাশের দেশগুলিতেই সীমাবদ্ধ ছিল।এই ভাইরাসের বিচরণ মূলত বানরজাতীয় প্রাণী এবং এডিস মশার মধ্যে সীমিত ছিল। একদশক আগে আফ্রিকার গবেষকগণ লক্ষ্য করলেন যিকা ভাইরাস চিকুনগুনিয়ার মতই দুনিয়ার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। উল্লেখ্য চিকুনগুনিয়া ভাইরাসও এডিস মশাবাহিত। তবে ওয়েস্ট নাইল ভাইরাস কিউলেক্স মশা দিয়ে ছড়িয়ে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে পীত জ্বর (yellow fever), ডেঙ্গি এবং চিকুনগুনিয়া ভাইরাস এডিস মশার মাধ্যমে মানুষের শরীরে ব্যাপকভাবে সংক্রমিত হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। আর সেই মিছিলে সামিল হয়েছে এতদিনের প্রায় অপরিচিত যিকা ভাইরাসও।
প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে দেখা যায় যিকা ভাইরাস সংক্রমণের লক্ষণ-উপসর্গ অনেকাংশে ডেঙ্গি জ্বরের মতই। এরফলেও জ্বর হয়, মাংসপেশীতে ব্যথা হয়, চোখে ব্যথা হয়, অত্যন্ত দুর্বল অনুভব হয় এবং ত্বকে লাল লাল দানা কিংবা ফুসকুড়ি উঠতে পারে। যিকা ভাইরাস মানুষের শরীরে প্রবেশের পরে ডেঙ্গির মতো ইমিউন প্রতিক্রিয়া প্রদর্শন করলেও; বিগত ৬০ বছরের পর্যবেক্ষণে কখনও যিকা ভাইরাস সংক্রমণের ফলে ডেঙ্গির মত রক্তক্ষরণ হওয়ার নমুনা দেখা যায়নি। তবে ফ্রেঞ্চ পলিনেসিয়ায় যিকা সংক্রমণের কারণে ব্যাপকভাবে গিলেন বার সিনড্রোমসহ (Guillain–Barré syndrome)অন্যান্য স্নায়ুরোগ হওয়ার প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে। কিন্তু সবাইকে যেটি সবচেয়ে আতঙ্কিত করেছে ব্রাজিলে নবজাত শিশুদের ব্যাপকভাবে ছোট মাথা বা মাইক্রোসেফালি(microcephaly)হওয়ার ঘটনা। এক হিসেবে দেখা যাচ্ছে ২০১৪ সালের চেয়ে ২০১৫ সালে ব্রাজিলে জন্মগ্রহণকারী শিশুদের মধ্যে মাইক্রোসেফালির হার ২০ গুণ বেশী হয়েছে।অক্টোবর ২০১৫ থেকে জানুয়ারী ২০১৬-এর মধ্যে ৩৫০০ শিশু মাইক্রোসেফালি নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছে। মাইক্রোসেফালি আক্রান্ত শিশুর মাথা তুলনামূলকভাবে ছোট এবং তাদের মস্তিস্কের আকারও ছোট হয়। পরবর্তীতে তাদের মৃগী ব্যারাম সহ নানাধরণের প্রতিবন্ধীত্ব দেখা দেয়। আর এরজন্য গর্ভকালে মায়েদের যিকা ভাইরাস সংক্রমণকে দায়ী মনে করা হচ্ছে।এরই ধারাবাহিকতায় মার্কিন রোগ প্রতিরোধ কর্তৃপক্ষ(CDC) গর্ভধারিণী মহিলাদের দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকা এবং ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জের ১৪টি দেশে সবধরনের ভ্রমণ সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করেছেন। এই ১৪টি দেশ হচ্ছেঃ ব্রাজিল, কলম্বিয়া, হাইতি, হন্ডুরাস, এল সালভেদর, ফেঞ্চ গায়ানা, গুয়েতেমালা, মারটিনিক, মেক্সিকো, পানামা, প্যারাগুয়ে, সুরিনাম, ভেনেজুয়েলা এবং পুর্টেরিকো ।
বলাবাহুল্য ডেঙ্গির মতো যিকা ভাইরাসের বিরুদ্ধে এখনও কোন টীকা আবিস্কার হয়নি। ডেঙ্গির চিকিৎসা যেমন শুধু উপসর্গ উপশমের মধ্যে সীমিত, যিকা ভাইরাস সংক্রমণের চিকিৎসাও উপসর্গভিত্তিক। যিকা ভাইরাসের ক্ষতিকর জটিলতা থেকে মুক্ত থাকার একমাত্র উপায় এটা প্রতিরোধ করা। আর তা মূলত এডিস মশার কামড় থেকে নিজেকে রক্ষা করা। অতএব ডেঙ্গি প্রতিরোধের জন্য এডিস মশার বিরুদ্ধে আমরা যে সকল পদক্ষেপ নেই, যিকা ভাইরাস সংক্রমণ প্রতিরোধের জন্যও একই ধরণের পদক্ষেপ নিতে হবে।         
তথ্যসূত্রঃ
1.       Fauci AS, Morens DM. Zika Virus in the Americas - Yet Another Arbovirus Threat. The New England journal of medicine. 2016 Jan 13. PubMed PMID: 26761185.
2.       http://www.cdc.gov/media/releases/2016/s0315-zika-virus-travel.html (Accessed on 19 January 2016)


Sunday, 17 January 2016

ধূমপান ছাড়ার জন্য ই-সিগারেট কোন কাজের নয়

আজকাল আমরা সবক্ষেত্রেই ইলেকট্রনিক কিংবা ডিজিটাল জিনিস পছন্দ করি। ধূমপান শরীরের জন্য ক্ষতিকর। দিনে দিনে এর বিরুদ্ধে প্রচারণা বেশ তীব্র হয়ে উঠেছে। কিন্তু সিগারেটের ব্যবসা বড়ই লাভজনক। অতএব নতুন কলাকৌশলের উদ্ভাবনা। বাজারে এসেছে “অ্যানালগ” সিগারেটের পরিবর্তে ই-সিগারেট। বলা হল যারা ধূমপান ছেড়ে দিতে চান, তাদের আর ভাবতে হবে না। চিরতরে ধূমপান ছাড়ার আগে কয়েকদিন ই-সিগারেট পান করলে ধূমপান ছাড়া কোন ব্যাপারই নয়।ব্যবসায়ীদের এমন প্রচারণায় আস্থা রেখে অনেকেই ধূমপান ছাড়ার আশায় ই-সিগারেট ধরেছেন। কিন্তু ই-সিগারেট আর তাদের ছাড়ছে না। সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে ই-সিগারেট ধূমপান ছাড়তে কোন সহায়তা তো করেই না; বরং যারা ই-সিগারেট পান করছেন তাদের ধূমপান ছাড়ার সম্ভাবনা স্বাভাবিকের চেয়ে ২৮% কম।অথচ ই-সিগারেটের ক্ষেত্রে ধূমপানের প্রচলিত আইন প্রযোজ্য নয়। অর্থাৎ ধূমপান নিষিদ্ধ এলাকাতেও যে কেউ ই-সিগারেট পান করতে পারে। এজন্য এখন সকলেই মনে করছেন ধূমপানের জন্য প্রচলিত সব ধরণের নিষেধাজ্ঞা ই-সিগারেটের জন্যও প্রযোজ্য হওয়া উচিত।


তথ্যসূত্রঃ Kalkhoran S, Glantz SA. E-cigarettes and smoking cessation in real-world and clinical settings: a systematic review and meta-analysis. Lancet Respir Med 2016; published online Jan 14.    

Thursday, 14 January 2016

প্রোটন পাম্প ইনহিবিটরের যত দোষ

ওষুধ হিসেবে প্রোটন পাম্প ইনহিবিটরের সফলতার কোন তুলনা নেই। কয়েক দশক ধরে এটা প্রেসক্রিপশনে সর্বাধিক লেখা ওষুধ। মূলত দুটো কারণে এটা হয়েছেঃ ডিসপেপসিয়ার চিকিৎসায় এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত; আর হৃদরোগে অ্যান্টিপ্লাটিলেট ওষুধের সঙ্গে পাকস্থলি থেকে কোন ধরণের রক্তক্ষরণ প্রতিরোধের জন্য এটা অবশ্যই ব্যবহার করা হয়। সুলভ এবং সহজলভ্য হওয়ার কারণে অনেকেই প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে এটা ব্যবহার করে থাকেন। বাংলাদেশসহ অনেক দেশে প্রেসক্রিপশন ছাড়াও এটা দোকানে কিনতে পাওয়া যায়। এতদিন মনে করা হতো প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর খুবই নিরাপদ ওষুধ; এর তেমন কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। কিন্তু এখন বাস্তবতা আর সে রকম মনে হচ্ছে না। দিনে দিনে প্রোটন পাম্প ইনহিবিটরের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে চলেছে। এই তালিকায় সর্বশেষ যুক্ত হয়েছে ক্রনিক কিডনি রোগের সমস্যা। সাম্প্রতিক পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে দীর্ঘসময় প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর ব্যবহার করলে ক্রনিক কিডনি রোগ হতে পারে। Atherosclerosis Risk in Communities(ARIC) study-তে অংশগ্রহণকারী প্রায় ১০ হাজারের বেশী রোগীর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে এদের মধ্যে যারা প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর ব্যবহার করেছেন তাদের মধ্যে ক্রনিক কিডনি রোগের হার ৫০ শতাংশ বেশী। অন্যান্য নির্ভরযোগ্য পর্যবেক্ষণ থেকেও দেখা যাচ্ছে প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর ব্যবহার করলে আসলেই কিডনির সমস্যা বেশী হয়ে থাকে। প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর ব্যবহার করলে তুলনামূলকভাবে স্বল্পমেয়াদী কিডনির সমস্যাও বেশী হয় এবং রক্তে ম্যাগনেসিয়ামের পরিমাণ কমে যায়। মনে করা হচ্ছে এই দুটি কারণেই শেষ পর্যন্ত ক্রনিক কিডনি রোগের সৃষ্টি হচ্ছে।
এ পর্যন্ত প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর ব্যবহার করার ফলে যে সকল গুরুতর সমস্যার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গিয়েছে তার পূর্ণ তালিকা হচ্ছেঃ ১) ক্রনিক কিডনি রোগ হওয়ার ৫০% সম্ভাবনা বেড়ে যায়   (Lazarus et al, 2015) ২) স্বল্পমেয়াদী কিডনি রোগের সম্ভাবনা ১৫০% বেড়ে যায় (Antoniou et al, 2015) ৩)অ্যাকিউট ইন্টারস্টিসিয়াল নেফ্রাইটিসের প্রকোপ দ্বিগুণ কিংবা তিন গুন বৃদ্ধি পায় (Antoniou et al, 2015) ৪) রক্তে ম্যাগনেসিয়ামের ঘাটতি বা হাইপোম্যাগনেসিমিয়া  হওয়ার প্রবণতা ৪৩% বেড়ে যায় (Cheungpasitporn et al, 2015) ৫) হার্ট অ্যাটাকের হার ১৬% বেশী এবং  হৃদরোগের কারণে মৃত্যুহার দ্বিগুণ হওয়ার প্রমাণ রয়েছে (Shah et al, 2015) ৬) অধিক হারে ক্লস্ট্রিডিয়াম ডিফিসিলি(Clostridium difficile) নামে পরিচিত ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ ঘটার হার ৭৪% বেড়ে যায় (Kwok et al, 2012) ৭) নিউমোনিয়ার সম্ভাবনা ৫% থেকে ৩৪% বেড়ে যায় (Filion et al, 2014 এবং Eom et al, 2011) এবং ৮) হাড় ভেঙ্গে যাওার প্রবণতা ৩৩% বেড়ে যায় (Zhou et al, 2015)।
এত রকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার প্রমাণ পাওয়ার ফলে গবেষকগণ এখন মনে করছেন প্রোটন পাম্প ইনহিবিটরের ব্যবহারের ক্ষেত্রে আমাদের সতর্কতা অবলম্বন করার সময় এসেছে। 

তথ্যসূত্রঃ
১) Lazarus B, Chen Y, Wilson FP, et al. Proton pump inhibitor use and the risk of chronic kidney disease. JAMA Internal Medicine. 2016:238-46.
২) Schoenfeld A, Grady D. Adverse effects associated with proton pump inhibitors. JAMA Internal Medicine. 2016:1-3.