শরীর ও মন নিয়ে লেখালেখি

Tuesday, 17 March 2015

স্ট্রোক বা মস্তিস্কের পক্ষাঘাত প্রতিরোধে ফলিক অ্যাসিডের ভূমিকা

বিভিন্ন ধরণের রোগ প্রতিরোধে ফলিক অ্যাসিডের ভূমিকা নিয়ে এ পর্যন্ত অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষা হয়েছে। পশ্চিমা পর্যবেক্ষণে এতদিন পর্যন্ত সত্যিকার অর্থে কোন ইতিবাচক ফলাফল আসেনি। কিন্তু সম্প্রতি  চীনের গবেষকদল এ সম্পর্কে অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক ফলাফল পেয়েছেন। চাইনিজ সোসাইটি অব কার্ডিওলজি এবং আমেরিকান কলেজ অব কার্ডিওলজির ২০১৫ সালের যৌথ বৈজ্ঞানিক অধিবেশনে ডঃ ইয়ং হুও এ সংক্রান্ত গবেষণার ফলাফল জানিয়েছেন এবং তা একই সঙ্গে জার্নাল অব আমেরিকান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের (JAMA) সাম্প্রতিক  সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে।

চাইনা স্ট্রোক প্রাইমারি প্রিভেনশন ট্রায়ালে ( The China Stroke Primary Prevention Trial-CSPPT) ২০,০০০-এর অধিক উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত ব্যক্তি অংশগ্রহণ করেছেন। এদের মধ্যে অর্ধেক উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য এনালাপ্রিল (enalapril) এবং ফলিক অ্যাসিড সেবন করেছেন আর বাকী অর্ধেক শুধু এনালাপ্রিল গ্রহণ করেছেন। সাড়ে চার বছর ওষুধ সেবনের পর ফলাফল বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে যারা এনালাপ্রিলের সঙ্গে ফলিক অ্যাসিড সেবন করেছেন তাদের মধ্যে অন্য গ্রুপের চেয়ে স্ট্রোকের হার তুলনামূলকভাবে কম হয়েছে।
ডঃ ইয়ং হুও চাইনিজ সোসাইটি অব কার্ডিওলজির বর্তমান সভাপতি। তিনি মনে করছেন গবেষণার এ ফলাফল শুধু চীনের জনগণের জন্য প্রযোজ্য তা নয়; বরং অন্যান্য দেশের উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তদের জন্যও প্রযোজ্য। এমনকি যাদের উচ্চ রক্তচাপ নেই তারাও ফলিক অ্যাসিড সেবনের মাধ্যমে স্ট্রোক হওয়ার সম্ভাবনা কমাতে পারেন।          
বর্তমানে দুনিয়া জুড়ে স্ট্রোকের প্রকোপ অস্বাভাবিক ভাবে বেড়ে চলেছে। বিশেষ করে চীনে স্ট্রোকের হার বিগত দুই দশকে খুবই বেড়েছে। এটা প্রতিরোধ করার জন্য সুলভ কোন ওষুধ একান্ত প্রয়োজনীয়। সেক্ষেত্রে তুলনামূলক ভাবে সস্তা এবং সহজলভ্য এনালাপ্রিল এবং ফলিক অ্যাসিড অনেকের মনেই উৎসাহ জাগিয়েছে । কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এর আগে পশ্চিমা পরীক্ষাসমূহে ফলিক অ্যাসিডের কার্যকারিতা প্রমাণিত হল না কেন? অনেকের ধারণা পশ্চিমা দেশে মানুষের শরীরে ফলিক অ্যাসিডের ঘাটতি থাকে না। কিন্তু চীনের ২০ থেকে ৬০ শতাংশ জনগণের শরীরে ফলিক অ্যাসিডের অভাব রয়েছে। এজন্য চীনের জনগণের ওপর ফলিক অ্যাসিড প্রয়োগ করে ভালো ফলাফল পাওয়া গিয়েছে।
যেহেতু তৃতীয় বিশ্বের অন্যান্য দেশের জনগণের মধ্যেও ফলিক অ্যাসিডের স্বল্পতা রয়েছে, সেজন্য এই পর্যবেক্ষণের ফলাফলকে বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্তদের স্ট্রোক প্রতিরোধের জন্য ফলিক অ্যাসিডের ভূমিকা নিয়ে আরও ব্যাপক পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।
তথ্যসূত্রঃ
1.      Huo Y, Li J, Qin X, et al. Efficacy of folic acid therapy in primary prevention of stroke among adults with hypertension in china: The CSPPT randomized clinical trial. JAMA: the journal of the American Medical Association. 2015. DOI:101001/jama.2015.2274.
2.      Stampfer M, Willett W. Folate supplements for stroke prevention: Targeted trial trumps the rest. JAMA: the journal of the American Medical Association. 2015. DOI:101001/jama.2015.1961





Tuesday, 3 March 2015

পুরুষের লিঙ্গের দৈর্ঘ্য

অবশেষে পুরুষের লিঙ্গের গড় দৈর্ঘ্য নির্ধারণ করা হল। আসলে পুরুষের লিঙ্গের গড় দৈর্ঘ্য কত সেটা নিয়ে একটা বিতর্ক বরাবরই ছিল। 

সম্প্রতি একদল গবেষক প্রায় ১৫,০০০ পুরুষের লিঙ্গের দৈর্ঘ্য হিসেব করে তার ফলাফল ব্রিটিশ জার্নাল অব ইউরলোজিতে প্রকাশ করেছেন। দেখা যাচ্ছে একজন পুরুষের উত্থিত লিঙ্গের দৈর্ঘ্য গড়পড়তা ১৩.১২ সেন্টিমিটার (৫.১৬ ইঞ্চি) এবং বেড় ১১.৬৬ সেন্টিমিটার ( ৪.৬ ইঞ্চি) হয়ে থাকে। স্বাভাবিক অবস্থায় লিঙ্গের দৈর্ঘ্য ৯.১৬ সেন্টিমিটার (৩.৬ ইঞ্চি)  এবং বেড় ৯.৩১ (৩.৭ ইঞ্চি)। ব্রিটিশ গবেষকদল মনে করছেন এ গবেষণার ফলাফল অনেক পুরুষের মনে তাদের লিঙ্গের দৈর্ঘ্য নিয়ে যে অসন্তোষ বা হীনমন্যতা আছে, তা দূর করবে এবং অনেকেই উদ্বেগ মুক্ত হবেন। যারা নিজের লিঙ্গ ক্ষুদ্র মনে করে দুশ্চিন্তায় ভুগে থাকেন তাদের জন্য অবশ্যই এই গবেষণার ফলাফল বিশাল স্বস্তি বয়ে আনবে। আর বাস্তবে এরকম পুরুষের সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। 

দেখা যাচ্ছে প্রকৃত পক্ষে ২.২৮% পুরুষের লিঙ্গ আসলেই ছোট এবং সমসংখ্যক পুরুষের লিঙ্গ অস্বাভাবিক বড় হয়ে থাকে। এই গবেষণায় ১৭ থেকে ৯১ বছর বয়সী পুরুষদের লিঙ্গের আকার হিসেব করা হয়েছে। ইউরোপ, এশিয়া, আফ্রিকা এবং আমেরিকার পুরুষদের ওপর পরিচালিত ২০টি গবেষণার ফলাফল এখানে হিসেবের মধ্যে আনা হয়েছে।

তথ্যসূত্রঃ  Veale D, Miles S, Bramley S, Muir G, Hodsoll J. Am I normal? A systematic review and construction of nomograms for flaccid and erect penis length and circumference in up to 15 521 men.  BJU International. 2015:n/a-n/a.


Wednesday, 18 February 2015

রজঃনিবৃত্তির পরে ৭ বছর তাপঝলক

অর্ধেকের বেশী মহিলা মেনোপজ বা রজঃনিবৃত্তির সাত বছর পরেও তাপ ঝলক অনুভব করতে পারেন এবং রাতে ঘামতে পারেন। সম্প্রতি JAMA Internal Medicine জার্নালে এই তথ্য প্রকাশিত হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৪৪৯ জন মহিলার ওপর ১৯৯৬ সাল থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত পর্যবেক্ষণের পর এটা জানানো হয়েছে।
   
দেখা যাচ্ছে মহিলাদের মেনোপজ পরবর্তী লক্ষণ-উপসর্গ গড়ে ৭.৪ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। এ সকল লক্ষণ সর্বোচ্চ ১১.৪ বছর পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছে। যাদের মেনোপজ কম বয়সে হয় তাদের ক্ষেত্রে এটা ৯.৪ বছর পর্যন্ত ঘটতে দেখা গিয়েছে। কৃষ্ণাঙ্গ মহিলাদের মেনোপজ পরবর্তী লক্ষণ গড়ে ১০ বছর এবং জাপানী এবং চীনা মহিলাদের গড়ে যথাক্রমে ৪.৮ এবং ৫.৪ বছর স্থায়ী হয়েছে। শ্বেতাঙ্গ মহিলাদের ক্ষেত্রে এটা ৬.৫ বছর স্থায়ী হয়।

সুতরাং মেনোপজের পরে দীর্ঘদিন যাবত এর আনুষঙ্গিক লক্ষণ উপসর্গ চলতে থাকলে অবাক হওয়ার কোন কারণ নেই। মেনোপজের আনুষঙ্গিক লক্ষণ-উপসর্গসমূহ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য এখন বিভিন্ন ধরণের ওষুধ রয়েছে। এক্ষেত্রে যে ব্যাপক গবেষণা চলছে তাতে ভবিষ্যতে আরও নানাবিধ অগ্রগতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।  

তথ্যসূত্রঃ
·         Avis NE, Crawford SL, Greendale G, et al. Duration of menopausal vasomotor symptoms over the menopause transition. JAMA Internal Medicine. 2015. Published online February 16, 2015.

·         Richard-Davis G, Manson JE. Vasomotor symptom duration in midlife women—research overturns dogma. JAMA Internal Medicine. 2015. Published online February 16, 2015.

Tuesday, 17 February 2015

মস্তিস্কের যৌবন ধরে রাখে ধ্যান?

 আজকাল মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে। কিন্তু মস্তিষ্কের ক্ষয়তো আর রোধ করা যায় না। জীবনের প্রথম দুই দশকের পর থেকেই মস্তিষ্কের ওপর বয়সের ছাপ পড়তে থাকে। বয়স যতই বাড়তে থাকে, মস্তিষ্কের ক্ষয়ও ততই বাড়তে থাকে। মস্তিস্ককে আজীবন সতেজ রাখার জন্য তাই চেষ্টার কমতি নেই। কিন্তু এ পর্যন্ত কোন প্রক্রিয়াই সফল প্রমাণিত হয় নি। তবে অনেকের ধারণা ছিল ধ্যান করলে হয়তো মস্তিষ্কের ওপর উপকারী প্রভাব পড়তে পারে। এবং এখন তা সত্য বলেই মনে হচ্ছে। আসলেই ধ্যান করলে মস্তিষ্কের বয়সজনিত ক্ষয় কম হয়। নতুন একটি পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে যারা দীর্ঘদিন ধরে ধ্যান করেছেন তাদের মস্তিষ্কের ধূসর বস্তু বা গ্রে ম্যাটারের ক্ষয় তুলনামূলকভাবে কম হয়েছে। অবাক করা বিষয় হচ্ছে ধ্যানীদের মস্তিষ্কের এই কম ক্ষয় হওয়ার বিষয়টি বেশ ব্যাপক। গবেষকগণ প্রকৃতপক্ষে মস্তিষ্কের ওপর ধ্যানের এমন সর্বব্যাপী প্রভাব আশা করেননি। মোট ১০০ জনের মস্তিষ্কের বিভিন্ন আধুনিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে এই পর্যবেক্ষণ কর্মটি সমাধা করা হয়েছে। মস্তিষ্কের ওপর ধ্যানের প্রভাব সম্পর্কে এ পর্যন্ত সম্পন্ন এটাই সত্যিকার অর্থে  বড় ধরণের এবং দীর্ঘ মেয়াদের আধুনিক পর্যবেক্ষণ।


তথ্যসূত্রঃ Luders E, Cherbuin N, Kurth F. Forever Young(er): Potential Age-defying Effects of Long-term Meditation on Gray Matter Atrophy. Frontiers in Psychology. 2015 2015-January-21;5. English.  

Tuesday, 10 February 2015

অস্ট্রেলীয়দের যৌন জীবন

সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকদের যৌন জীবনের একটি সমীক্ষার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে। দেখা যাচ্ছে বিগত ১০ বছরে অস্ট্রেলীয়দের জীবনে নিয়মিত যৌন মিলনের হার ২০ শতাংশ কমে গিয়েছে। অস্ট্রেলিয়ার প্রথম যৌনস্বাস্থ্য সম্পর্কিত জরীপ ১০ বছর আগে হয়েছিল। তখন বলা হয়েছিল অস্ট্রেলীয়রা সপ্তাহে ১.৮ বার যৌন মিলন করে থাকে। কিন্তু এবার ১৭,০০০ অংশগ্রহনকারীর উপর জরীপে দেখা যাচ্ছে তা সপ্তাহে ১.৪ বারে নেমে এসেছে। সমীক্ষায় অংশগ্রহণকারীরা সপ্তাহে ২ থেকে ৪ বার যৌন সম্পর্ক উপভোগ করার আশা ব্যক্ত করেছে। কিন্তু তাদের সে আশা পূরণ হচ্ছে না।  
এবারের সমীক্ষার প্রধান জুলিয়েট রিখটার ৩০ বছর যাবত মানুষের যৌনসম্পর্ক নিয়ে গবেষণা করছেন। তিনি মনে করছেন অস্ট্রেলীয়দের যৌন জীবন এমন মরুভুমি হয়ে যাওয়ার জন্য  ল্যাপটপ এবং মোবাইল ফোন দায়ী। কারণ আজকাল অফিস আর বাসার মধ্যে সীমারেখা মুছে গিয়েছে। অনেকে বাসায় বসেও অফিসের মেইল চেক করছেন, জরুরী কাজ কর্ম সারছেন। আর এটা নিত্যদিনের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। ফলে দাম্পত্য জীবন সংক্ষিপ্ত হয়ে আসছে।  অবশ্য এক্ষেত্রে ব্রিটিশদের অবস্থাও খারাপ। তারা আরও কম যৌন মিলনের সুযোগ পাচ্ছে। ব্রিটিশরা ১৯৯০ সালে প্রতিমাসে গড়ে ৫ বার যৌন মিলনের সুযোগ পেত; ১০ বছর আগে তা কমে হয়েছিল সপ্তাহে একবার; বর্তমানে তা হয়েছে প্রতিমাসে ৩ বার। অর্থাৎ অস্ট্রেলীয়দের চেয়ে ব্রিটিশরা গড়ে প্রায় অর্ধেক সেক্স করার সুযোগ পাচ্ছে।
গবেষকগণ বলছেন আমেরিকা এবং ফ্রান্সেও একই প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে।   
জাপানের অবস্থা আরও সঙ্গীন। তাদের বেডরুমে রীতিমতো খরা চলছে। বলা হচ্ছে জাপানে বিবাহিতদের ৪০ শতাংশ প্রতিমাসে ১ বার যৌন সম্পর্ক করার সুযোগ পায়।
অবশ্য জুলিয়েট রিখটার মনে করছেন সেক্সই তো আর জীবনের সব কিছু নয়। অস্ট্রেলীয় দম্পতিদের মনের মিল খুব বেশী। আর তাদের যৌনজীবনে এখন বৈচিত্র্য অনেক বেশী। এবারের সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে আগের চেয়ে ১৫ শতাংশ বেশী মহিলা এবং ৮ শতাংশ বেশী পুরুষ ওরাল সেক্স করছে। গড়ে পুরুষদের জীবনে ১৮ জন মহিলা এবং মেয়েদের জীবনে ৮ জন পুরুষ সঙ্গী এসেছে। সমকামী পুরুষেরা গড়ে ৯৬ জন সঙ্গীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে; আর সমকামী মহিলারা গড়ে ৬ জনের সঙ্গ লাভ করেছে।  যৌন জীবনে ডাবল স্ট্যান্ডার্ড আগের চেয়ে কমেছে। মহিলারা আজকাল প্রায় পুরুষদের মতোই বহুচারিনী হয়ে উঠছে।  

Saturday, 7 February 2015

প্রতি দুইজনে একজনের ক্যান্সার

নতুন এক হিসেবে দেখা যাচ্ছে বিলেতে ১৯৬০ সালে যারা জন্মগ্রহণ করেছেন তাদের অন্তত প্রতি দুইজনে একজনের জীবনের কোন না কোন পর্যায়ে ক্যানসার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
১৯৩০ সালে যাদের জন্ম হয়েছে তাদের চেয়ে ১৯৬০ সালে জন্মগ্রহণকারীদের মধ্যে ক্যানসারের প্রকোপ তুলনামূলকভাবে বেশী। মোট শনাক্ত করা ক্যানসারের ৬০ শতাংশ ৬৫ বছরের বেশী বয়সীদের হয়েছে। বেশীদিন বাঁচলে ক্যানসার বেশী হবে সেটা নিয়ে অবাক হওয়ার তেমন কিছু নেই। তারপরেও ধূমপান নিবারণ, শারীরিক পরিশ্রম, মদ কম পান করা, ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখা ক্যানসার প্রতিরোধে বিশেষ ভূমিকা রাখে।  প্রতি ৫ টির মধ্যে ২ টি ক্যানসার জীবনাচরণ বদলে প্রতিরোধ করা সম্ভব।


তথ্যসূত্রঃ Ahmad AS, Ormiston-Smith N, Sasieni PD. Trends in the lifetime risk of developing cancer in Great Britain: comparison of risk for those born from 1930 to 1960. Br J Cancer. 2015. Published online February 3, 2015. 

Saturday, 24 January 2015

“বিশ্ব কোলাকুলি” দিবস

গত পরশু দিন রাস্তায় দেখি এক ভদ্রলোকের পিঠে একটা পোস্টার লাগানো। তাতে লেখা আছে, “বিনামূল্যে কোলাকুলি(free hug)।” অর্থাৎ কেউ চাইলে তাকে আলিঙ্গন করতে পারে। এজন্য কোন পয়সা দিতে হবে না। ঘটনা কি?

পরে শুনি ২১ জানুয়ারি নাকি “বিশ্ব কোলাকুলি” দিবস। তাই উনি মুফতে কোলাকুলি বিলিয়ে বেড়াচ্ছেন। কয়েকজন সুন্দরী রমণী তাকে ‘কোলাকুলি’ করার জন্য সারি ধরে দাঁড়িয়ে আছে । 
এমন একটি দিবস আছে তা আমার জানা ছিল না। পরে আরও ভালো করে বুঝতে পারলাম আমাদের জ্ঞাতি ভাইদের ‘কোলাকুলির’ অন-লাইন ছবি দেখে। আহা! যদি বাংলাদেশের দুই দলের সবাই মিলেমিশে এমন কোলাকুলি করতে পারতো! 



যাহোক কোলাকুলির গুণাগুণ পড়ে আমি তাজ্জব। এত বছরের মেডিক্যাল সায়েন্সে চলাফেরা করলাম; অথচ কোলাকুলির উপকারই ভালো করে দেখা হয় নাই। আমার মতো কেউ এ বিষয়ে অজ্ঞ থাকলে তাদের জন্য নীচে কোলাকুলির দশটা উপকার উল্লেখ করছিঃ

১) কোলাকুলি সুখী হওয়ার অব্যর্থ দাওয়াই। আমরা চেনা-অচেনা যার সঙ্গেই কোলাকুলি করি না কেন এর ফলে আমাদের শরীরে ‘অক্সিটোসিন’ নামে পরিচিত হরমোন নিঃসরিত হয়। আর এই হরমোন আমাদের মনে কুলকুল সুখের অনুভূতি জাগায়। 
২) কোলাকুলি করলে উদ্বেগ কমে। কারণ কোলাকুলি যেমন ‘অক্সিটোসিন’-এর পরিমাণ বাড়ায়, তেমন আমাদের শরীরে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসোলের পরিমাণ কমিয়ে দেয়।
৩) শিশুদের খাবার এবং পানির মতো প্রচুর কোলাকুলির প্রয়োজন। গবেষকগণ বলছেন শিশুকে প্রচুর আলিঙ্গন না করলে তার স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়। 
৪) কোলাকুলি করলে ছাত্রছাত্রীদের পড়ালেখার উন্নতি হয়! 
৫) কোলাকুলি করলে প্লেয়ারদের খেলার মান বাড়ে। দেখা গিয়েছে যে দলের প্লেয়াররা বেশী বেশী কোলাকুলি করে তাদের দলের বিজয়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশী।
৬) কোলাকুলি করলে আমাদের ডাক্তারের কাছে কম যেতে হয়। কারণ কোলাকুলি থাইমাস গ্রন্থিকে উদ্দীপিত করে। ফলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যায়।
৭) একই কারণে কোলাকুলি করলে শরীরে জীবাণু সংক্রমণ কম হয়।    
৮) কোলাকুলি হৃদযন্ত্রকে সুস্থ-সবল রাখে। 
৯) যে দম্পতি বেশী বেশী কোলাকুলি করে তারা সুখী দম্পতি। 
১০) কোলাকুলি বিনা বাক্য ব্যয়ে প্রমাণ করে কারও প্রতি আমাদের ভালবাসা; আমরা কাউকে কতটা গুরুত্ব দেই।  

অতএব দুনিয়ার সুখ-শান্তি বাড়ানোর জন্য আমরা ‘কোলাকুলি’র ব্যাপারে যেন  কোন কৃপণতা না করি। জয় ‘কোলাকুলি’ দিবস। বিশ্ব ‘কোলাকুলি’ দিবস জিন্দাবাদ।

Tuesday, 27 May 2014

সঙ্গীত চিকিৎসা


সঙ্গীত শুধু বিনোদনের বিষয় নয়। সঙ্গীতের রোগ নিরাময় করার ক্ষমতাও আছে।

২০১১ সালে ৩২ টি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণায় ৩১৮১ জনের উপরে পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল। এখানে দেখা যায় সঙ্গীত দুশ্চিন্তা এবং উদ্বেগ লাঘব করে, বিষণ্ণতা প্রশমন করে। এদের মধ্যে সাতটি পর্যবেক্ষণে দেখা যায় সঙ্গীত ব্যথা উপশম করে এবং ৪ টি পর্যবেক্ষণে হৃদঘাত কমানোর প্রমাণ পাওয়া যায়। শুধু তাই নয় সঙ্গীত জীবনের মান উন্নত করে।

ক্যানসারে আক্রান্ত হওয়া যে কারও জন্য শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক  উৎকণ্ঠার বিষয়। সম্প্রতি বিভিন্ন ধরনের রোগের চিকিৎসায়  সঙ্গীতের ভূমিকা নিয়ে গভীর বিশ্লেষণ করা হয়েছে। ২০১০ সালে ৩০ টি  পর্যবেক্ষণে ১৮৯১ জন ক্যানসার আক্রান্ত রোগীর ওপর সঙ্গীতের প্রভাব বিশ্লেষণ করা হয়। এখানেও দেখা যায় সঙ্গীত রোগীদের উদ্বেগ প্রশমন করে, মুড ভালো করে এবং সার্বিকভাবে রোগীদের অবস্থা উন্নত করে। আমরা সকলেই জানি ক্যানসারের রোগীদের অনেক সময় অসম্ভব ব্যথা হয়। দুটি গুরুত্বপূর্ণ রিভিউয়ে দেখা যাচ্ছে গান ক্যানসারের ব্যথা উপশমে সক্ষম।

স্ট্রোকের পরে অনেক রোগী বিষণ্ণতায় ভুগে থাকে। সাধারণত প্রতি তিন জন স্ট্রোকের রোগীর মধ্যে অন্তত একজন উল্লেখযোগ্য বিষণ্ণতায় ভুগে থাকে। এটা স্ট্রোক নিরাময়ের পথে অন্তরায়। স্ট্রোকের পরে বিষণ্ণতা হলে রোগের জটিলতা বাড়ে, মৃত্যু ঝুঁকি বেড়ে যায়। চিকিৎসকগণ সব সময় আশা করেন যেন স্ট্রোকের পরে কারও বিষণ্ণতা না হয়। এজন্য নানারকম ওষুধ ব্যবহার করা হয়। পাশাপাশি অন্যান্য পদ্ধতিও প্রয়োগ করা হয়। যেমন- সাইকো থেরাপি, আকুপাংচার, বৈদ্যুতিক শক, সঙ্গীত ইত্যাদি। সঙ্গীতের সাহায্যে স্ট্রোকের পরে বিষণ্ণতা লাঘবে ভালো উপকার পাওয়া গিয়েছে।

গর্ভবতী মহিলাদের ওপরেও সঙ্গীতের প্রভাব দেখা হয়েছে। দেখা গিয়েছে সুমধুর সঙ্গীত গর্ভবতী মহিলাদের রক্তচাপ স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। সঙ্গীত আনন্দ দেয়, সেজন্যই এমন হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে না। গবেষকগণ মনে করছেন সঙ্গীত কোন কারণে আসলেই রক্তচাপ কমাতে সাহায্য করে।   

কিন্তু সঙ্গীত কিভাবে আমাদের সুস্থ করে তোলে? সঙ্গীতের মূল বিষয় শব্দ। আর শব্দের মূলে রয়েছে কম্পন। গবেষকগণ এখন বিভিন্ন ধরণের শব্দ কম্পন নিয়ে পরীক্ষা করছেন। কি ধরণের শব্দ কম্পন কতক্ষণ ব্যবহার করলে কেমন উপকার হয় সেটাই এখন দেখার বিষয়। মনে করা হচ্ছে বিভিন্ন ধরণের সঙ্গীতের শব্দ কম্পন শরীরে বিভিন্ন রকম প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে এবং এরই কোন কোনটি আমাদের জন্য উপকারী। তারা মনে করছেন অচিরেই কোন রোগের জন্য কি ধরণের সঙ্গীত কতক্ষণ, কত বার এবং কতদিন শোনা দরকার তা নির্ধারণ করা সম্ভব হবে। তখন চিকিৎসকেরা বিভিন্ন রোগের জন্য প্রেসক্রিপশন আকারে সঙ্গীতের পরামর্শ প্রদান করতে পারবেন।

তথ্যসূত্রঃ
1. Overview of Systematic Reviews. Evidence-based complementary and alternative medicine: eCAM. 2014;2014:170396. PubMed PMID: 24817897. Pubmed Central PMCID: PMC4003746. 
2. Nabavi SF, Turner A, Dean OM, Sureda A, Nabavi SM. Post-Stroke Depression Therapy: Where are we now? Current neurovascular research. 2014 May 22. PubMed PMID: 24852795. 
3. Zhang JM, Wang P, Yao JX, Zhao L, Davis MP, Walsh D, et al. Music interventions for psychological and physical outcomes in cancer: a systematic review and meta-analysis. Supportive care in cancer: official journal of the Multinational Association of Supportive Care in Cancer. 2012 Dec; 20(12):3043-53. PubMed PMID: 23052912. 
4. Fritz TH, Ciupek M, Kirkland A, Ihme K, Guha A, Hoyer J, et al. Enhanced response to music in pregnancy. Psychophysiology. 2014 May 18. PubMed PMID: 24835575. 
5. Bradt J, Dileo C, Grocke D, Magill L. Music interventions for improving psychological and physical outcomes in cancer patients. The Cochrane database of systematic reviews. 2011 (8):CD006911. PubMed PMID: 21833957.

Sunday, 18 May 2014

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য জনসম্পদ

২০০৭ সালে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ক্ষেত্রে জনসম্পদের ওপর অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য একটি জরীপ করা হয়েছিল। এই  জরীপের ফলাফলে দেখা যায় আমাদের প্রতি ১০,০০০ মানুষের জন্য- 
  • ৫ জন চিকিৎসক
  • ২ জন নার্স 
  •  ১২ জন হাতুড়ে গ্রাম্য চিকিৎসক
  •  ১১ জন ফার্মেসীর ওষুধ বিক্রেতা
  • ৩৩ জন কবিরাজ বা বৈদ্য
  • ৩২ জন ঝাড়ফুঁক দেওয়ার লোক এবং
  • ৬ জন হোমিওপ্যাথ ডাক্তার আছে।

এরা সবাই কম-বেশী বাংলাদেশে চিকিৎসা সেবা দেয় এবং ওষুধের পরামর্শ দেয়।

কিন্তু আমাদের স্বাস্থ্য জনশক্তির সংখ্যা দক্ষিণ এশিয়ার যেকোনো দেশের তুলনায় অনেক কম। যেমনঃ আমাদের দেশে প্রতি ১০০০০ মানুষের জন্য চিকিৎসক, দাঁতের ডাক্তার এবং নার্স আছে সাকুল্যে ৭.৭ জন। শ্রীলংকায় এই সংখ্যা ২১.৯ জন, ভারতে ১৪.৬ জন, পাকিস্তানে ১২.৫ জন। সহস্রাব্দের লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মনে করে এই সংখ্যা প্রতি ১০০০০ জনগণের জন্য ২৩.০ জন হওয়া উচিত। 
  
আমাদের সেবিকা এবং চিকিৎসকের অনুপাত ২:৫ । অর্থাৎ প্রতি ৫ জন চিকিৎসকের জন্য ২ জন নার্স আছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে প্রতি ৩ জন নার্সের জন্য ১ জন চিকিৎসক থাকা উচিত। যে কোন কমিউনিটির জন্য পর্যাপ্ত নার্স থাকা বিশেষ জরুরী। কারণ হাসপাতাল এবং ক্লিনিকের চিকিৎসা সেবার প্রাণশক্তি নার্স। আমাদের মেডিক্যাল টেকনোলজিস্টেরও স্বল্পতা রয়েছে। প্রতি ১ জন চিকিৎসকের জন্য ৫ জন মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট থাকা উচিত। সার্বিকভাবে এই জরীপে দেখা যায় উন্নয়নশীল দেশের মানদণ্ডে বিবেচনা করলে আমাদের আরও ৬০,০০০ চিকিৎসক, ২৮০,০০০ নার্স এবং ৪৮৩,০০০ মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট দরকার। 


তথ্যসূত্রঃ Ahmed SM, Hossain MA, Rajachowdhury AM, Bhuiya AU. The health workforce crisis in Bangladesh: shortage, inappropriate skill-mix and inequitable distribution. Human resources for health. 2011;9:3.

Wednesday, 7 May 2014

যৌনক্ষমতা বাড়ানোর “সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক হার্বাল ওষুধ” আসলে কতটুকু নিরাপদ?

পথে-ঘাটে কিংবা বাসে-লঞ্চে চলতে ফিরতে আমরা পুরুষের যৌন ক্ষমতা বাড়ানোর ওষুধ নিয়ে নানারকম বিজ্ঞাপন দেখি কিংবা হকারদের বক্তৃতা শুনতে পাই। অনলাইনেও পুরুষের “বিশেষ অঙ্গ” দীর্ঘ করার জন্য কিংবা যৌন শক্তি বাড়ানোর জন্য নানারকম প্রচারণা দেখা যায়। এ সব ওষুধে আসলে কি থাকে এবং তা কতটুকু নিরাপদ? 

সম্প্রতি ইতালির কয়েকজন গবেষক এ সম্পর্কে বিস্তারিত গবেষণা করেছেন। তাদের বক্তব্য হচ্ছে, যৌন ক্ষমতা বাড়ানোর অনেক রকম ওষুধ আছে সত্য; কিন্তু এদের অধিকাংশই মানসিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে, এমন কি ম্যানিয়া পর্যন্ত হতে পারে।এজন্য তারা পথে ঘাটে কিংবা অন লাইনে বিক্রি হওয়া এসব ওষুধ সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়াতে চান। এসকল ওষুধের ওপর কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। যারা এধরনের ওষুধ সেবন করেন তাদের এমনিতেই মানসিক সমস্যা থাকে; আবার ওষুধ সেবনের ফলে তা আরও বেড়ে যায়। বিগত বছরগুলিতে যৌনক্ষমতাবর্ধক ওষুধ বিক্রির পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। এদের প্রতিটির গায়েই লেখা থাকে “সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক” কিংবা “হার্বাল”। অতএব কোন পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া নেই। অধিকাংশ পুরুষ আরও লম্বা “বিশেষ অঙ্গ” এবং আরও বেশী সময় রমণের আশায় সহজেই এ সকল বাণিজ্যিক প্রচারণার ফাঁদে পড়ছে। এই ধরণের ভিত্তিহীন  প্রচারণা  জনস্বাস্থ্য এবং সুস্থ চিন্তাভাবনার পথে বিশাল অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। 

গবেষকদল বিভিন্ন পত্রপত্রিকা এবং অনলাইন থেকে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত ১০৮ রকমের যৌন ক্ষমতা বাড়ানোর ওষুধের বিজ্ঞাপন সংগ্রহ করেছেন। পরীক্ষা করে দেখা যাচ্ছে এসবের মধ্যে মূলত ৪ ধরণের ওষুধ থাকেঃ ইওহিম্বিন (yohimbine), ম্যাকা (maca), জিঙ্কো বিলোবা (ginkgo biloba)  এবং হর্নি গোট উইড (horny goat weed )। এই ৪ রকমের ওষুধই আসক্তিসহ উদ্বেগ, প্যানিক, মুডের পরিবর্তন, মানসিক বিভ্রমজাতীয়  মানসিক সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। 

ইওহিম্বিন বিভিন্ন গাছ থেকে সংগ্রহ করা হয়। বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে দাবী করা হয়েছে এটা ধ্বজ-ভঙ্গের জন্য কার্যকরী। আবার এ ওষুধ সেবন করলে ওজন কমে এবং সুস্বাস্থ্য লাভ করা যায়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে ইওহিম্বিনের অনেক রকম পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া রয়েছে। এটা সেবন করলে মানসিক অস্থিরতা এবং উদ্বেগ সৃষ্টি হয়; পরিপাক তন্ত্রের সমস্যা হতে পারে, হৃদঘাত বেড়ে যায় এবং উচ্চ রক্তচাপ হতে পারে।   
ম্যাকা (Lepidium meyenii) এক বিশেষ ধরণের গাছ থেকে সংগৃহীত ওষুধ। এর মূল উপাদান টেট্রাহাইড্রো-বিটা-কারবোলিন। দাবী করা হয় এটা যৌন শক্তি বাড়ায় এবং বন্ধাত্য রোধ করে। কিন্তু টেট্রাহাইড্রো-বিটা-কারবোলিন এমন একটি রাসায়নিক উপাদান যা ক্ষুধা বাড়ায় এবং আসক্তি সৃষ্টি করে। 

হর্নি গোট উইড সেবন করলে মানসিক উন্মত্ততা সৃষ্টি হয়; হৃদপিণ্ডের ছন্দ বিঘ্নিত হয় এবং ত্বকে নানারকম প্রতিক্রিয়া হতে পারে। 

জিঙ্কো বিলোবা স্মৃতিশক্তি বাড়ানোর জন্য ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এটা সুস্থ মানুষের শরীরেও অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ ঘটাতে পারে। এ ছাড়া এটা অন্যান্য ওষুধ যেমন অ্যালপ্রাজোলাম, সিটালোপ্রাম ইত্যাদি ওষুধের সঙ্গে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। এমন কি মানসিক উন্মত্ততা সৃষ্টি করতে পারে। 

এ চার রকম ওষুধ ছাড়া আরও পাওয়া গিয়েছে হরিণের শিংয়ের চামড়া। কিন্তু এটা সেবন করলে প্রকৃতপক্ষে শরীর ভেঙে যায় এবং নানারকম স্নায়বিক সমস্যা হতে পারে।

মজার বিষয় হচ্ছে এসকল ওষুধ বিক্রির ওপর প্রায় কোনরকম নিয়ন্ত্রণই নাই। যে কেউ যে কোন সময় ইচ্ছে করলেই প্রেসক্রিপশন ছাড়াই এসব ওষুধ কিনতে পারে এবং  সেবন করতে পারে। সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হচ্ছে এসকল ওষুধের পার্শ্ব-প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে কোন হিসেব নিকেশ নাই এবং সেটা নিয়ে কোন জবাবদিহিতার ব্যবস্থাও নাই। অনেকেই জানেন না যে যৌনক্ষমতা বাড়ানোর “সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক হার্বাল” ওষুধের নামে তারা যা সেবন করছেন, সেগুলির মধ্যে অনেক ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান রয়েছে এবং এসকল ওষুধও অন্যান্য অ্যালোপ্যাথিক ওষুধের মতো পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে। এসকল ওষুধের কোন প্রকার মান নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না থাকার ফলে অনেক সময় এর মধ্যে আসলে কি উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে কিংবা আদৌ কোন ওষুধ আছে কিনা সে সম্পর্কেও কোন কিছু জানা যায় না। 

তথ্যসূত্রঃ American Psychiatric Association's 2014 Annual Meeting. Abstract NR4-44. Presented  May 4, 2014.

Tuesday, 29 April 2014

একটি সাঁকোর জন্য আর কতদিন ?

এক ভদ্রলোক নদীর পাড় দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ দেখতে পেলেন নদীতে একজন ডুবন্ত মানুষ। ভদ্রলোক কালবিলম্ব না করে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়লেন এবং ডুবন্ত মানুষটিকে উদ্ধার করে তীরে তুলে আনলেন। কিন্তু পাড়ে উঠতে না উঠতেই তিনি দেখতে পেলেন আরেক জন ডুবন্ত মানুষ। তিনি তাকেও উদ্ধার করলেন। দ্বিতীয়জনকে নিয়ে আসতে না আসতেই তার চোখে পড়লো নদীতে আরও কয়েকজন মানুষ ডুবে যাচ্ছে। এভাবে ডুবন্ত মানুষদের উদ্ধার করতে করতে ভদ্রলোক নিজেই অসুস্থ হয়ে নদীর পাড়ে শুয়ে পড়লেন। তিনি মনে মনে চিন্তা করছেন যে এই নদীতে এত মানুষ ডুবে যাচ্ছে কেন?

পরদিন তিনি নদীর পাড় দিয়ে উজানের দিকে হাঁটা শুরু করলেন। দুই পাড়ে কোন তেমন জনবসতি নেই। কিন্তু কিছু দূর যাওয়ার পরে তিনি দেখতে পেলেন নদীর দুই পাড়ে দুটি গ্রাম। এক গ্রামের মানুষ নানা প্রয়োজনে অন্য গ্রামে যায়। কিন্তু নদীতে কোন পারাপারের ব্যবস্থা নেই। নদীর ওপর কোন সাঁকোও নেই। ফলে প্রতিদিন অনেকেই নদী পার হতে গিয়ে ডুবে যায়।

কিন্তু ভদ্রলোকের পক্ষে একা কি আর এত ডুবন্ত মানুষকে প্রতিদিন উদ্ধার করা সম্ভব। এরজন্য দরকার একটি সাঁকো। আমাদের অবস্থা হয়েছে এরকম। আমাদের প্রধান রাজনৈতিক দল দুটি দুই পাড়ের দুটি গ্রাম। মাঝখানে বিশাল নদী; কিন্তু নেই কোন সাঁকো। আমরা সবাই ডুবন্ত মানুষ।


আজ চিকিৎসক-সংবাদকর্মী কিংবা চিকিৎসক-রোগীর সঙ্গে যে সকল সমস্যা তার মূলেও সেই নদী। কিন্তু নেই সাঁকোর বন্ধন। আমরা একটি সাঁকোর জন্য আর কতদিন অপেক্ষা করবো?  

Monday, 28 April 2014

স্যার-এ কি সার?

“স্যার” শব্দ পাওয়া যায় মধ্যযুগের ফরাসী ভাষায়। ফরাসী messire  থেকে sire এবং পরে তা পরিণত হয়েছে sir শব্দে। এর অর্থ “আমার প্রভু” (mylord)। পুরনো ফরাসী ভাষায় sieur এসেছে Seigneur থেকে। এ শব্দটির অর্থও “প্রভু”। ল্যাটিন ভাষায় সিনিয়র বা গুরুজনদের উদ্দেশ্য করেও এটা বলা হতো এবং মূলত সেখান থেকে এটা ইউরোপীয় ভাষাসমূহে প্রবেশ করে। ১২০৫ সাল থেকে ইংরেজ নাইট বা ব্যারনদের(knight or baronet) সম্মান করে “স্যার” সম্বোধন করা হতো। ইংরেজীতে “স্বাধীন পুরুষ”, “পিতা” এবং “গুরুত্বপূর্ণ মানুষ” বোঝানোর জন্যও স্যার বলা হয়ে থাকে। পরবর্তীকালে স্যার শব্দের বিচিত্র ব্যবহার দেখা যায়। সাধারনত উচ্চ পদস্থ এবং মর্যাদার কর্মকর্তাদের এবং শিক্ষকদের “স্যার” সম্বোধন করা হতে থাকে। ব্যবসায়ীরা তাদের ক্রেতাদেরকেও স্যার সম্বোধন করে থাকে।  মহিলাদের জন্য সমতুল্য শব্দ হচ্ছে “ম্যাম” বা “ম্যাডাম” (ma'am or madam)। তবে কম বয়সী মেয়েরা এটা শুনতে পছন্দ করে না। তারা “মিস” (miss) ডাকলে আনন্দ পায়। মহিলাদের ক্ষেত্রে নাইটের সমতুল্য শব্দ হচ্ছে “ডেম” বা “লেডি”( Dame or Lady)। নাইটের পত্নীদের এভাবেই সম্বোধন করা হয়।

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের যখন সূর্য অস্ত যেতো না তখন প্রতি বছর অনেককে ঘটা করে “নাইট” (এবং লেডি) উপাধি দেওয়া হতো। ভারতে ব্রিটিশ রাজকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ১৮৬১ সাল থেকে অনেক বিখ্যাত আমলা, সামরিক কর্মকর্তা এবং প্রভাবশালী ভারতীয় নাগরিককে the Order of the Star of India প্রদান করা শুরু হয়। ১৮৭৮ সাল থেকে জুনিয়র অফিসারদের The Order of the Indian Empire উপাধি দেওয়া প্রচলন হয়। এসকল তকমা প্রাপ্তদের “স্যার” বলা হতো। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ভারত  ভেঙ্গে স্বাধীন ভারত এবং পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর এ সকল উপাধি দেওয়া বন্ধ হয়ে যায়। ভারতে এটা সরকারীভাবে নিষিদ্ধ হয় ১৯৫০ সালে আর পাকিস্তান নিষিদ্ধ করে ১৯৫৬ সালে।

মজার বিষয় হচ্ছে আধুনিক পশ্চিমা দুনিয়ায় এখন আর সাধারনভাবে “স্যার” সম্বোধন শোনা যায় না। প্রত্যেকের নামের দুটি অংশ-প্রথম নাম এবং পারিবারিক নাম। যেমন একজনের নাম হায়দার আলী। হায়দার আলীর পরিচিতজন তাকে শুধু “হায়দার” বলে ডাকে; কিন্তু যারা তাকে চেনেনা তারা তাকে “মিঃ আলী” বলে সম্বোধন করে। হায়দার আলী যদি কোন স্কুলের টিচার হন, তাহলে তার সকল ছাত্রছাত্রী তাকে “মিঃ আলী” বলে সম্বোধন করে থাকে। কিন্তু সহকর্মীরা “তাকে” হায়দার বলে ডাকে।

ততোধিক মজার বিষয় হচ্ছে ব্রিটিশদের প্রভুত্ব থেকে মুক্ত হয়ে উপমহাদেশের জনগণ ব্রিটিশ তকমা দেওয়ার প্রচলন আদেশ জারী করে বন্ধ করেছে। কিন্তু নিজেরা এখনও “স্যার” অর্থাৎ “হে প্রভু” ডাক শুনতে চায়; এই বেলায় অফিসার, ডাক্তার, উকিল-মোক্তার কিংবা বিচারক কোন ফারাক দেখা যায় না। সবার মনের ভিতরেই প্রভু হওয়ার সুপ্ত বাসনা। কেউ সেবক হতে চায় না। 

Tuesday, 15 April 2014

স্মার্ট ফোন এবং ট্যাবলেট পিসি-র টাচ স্ক্রিনের জীবাণু

চিকিৎসক এবং হাসপাতালের স্বাস্থ্য কর্মীদের স্মার্ট ফোন এবং ট্যাবলেট পিসি-র টাচ স্ক্রিন নানারকম জীবাণু দ্বারা আক্রান্ত। সম্প্রতি জার্মান হাসপাতালে চিকিৎসক এবং সেবিকাদের স্মার্ট ফোন এবং ট্যাবলেট পিসি-র টাচ স্ক্রিন পরীক্ষা করে এমনই দেখা গিয়েছে। এটা শুধু চিকিৎসক এবং সেবিকাদের ব্যক্তিগত সুস্থতার জন্যই হুমকি নয়, তাদের পরিবার এবং রোগীদের জন্যও বিপজ্জনক হতে পারে। স্মার্ট ফোন এবং ট্যাবলেট পিসি-র টাচ স্ক্রিনে যে সকল জীবাণু শনাক্ত করা হয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছেঃ Staphylococcus aureus, Enterococcus, and Enterobacteriaceae জাতীয় ব্যাকটেরিয়া। এজন্য সতর্কতা হিসেবে সকল চিকিৎসক এবং সেবিকার উচিত তাদের স্মার্ট ফোন এবং ট্যাবলেট পিসি-র টাচ স্ক্রিন নিয়মিত পরিস্কার করা; বিশেষত হাসপাতাল থেকে বাড়ী ফেরার আগে অবশ্যই তা করা উচিত। অন্যথায় তাদের শিশুদের মধ্যে খুব সহজেই এসকল জীবাণু সংক্রমিত হতে পারে। কারণ বাড়ী ফেরার পর অনেকের বাচ্চাই বাবা-মায়ের ফোন নিয়ে খেলা করে কিংবা হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করে থাকে।   

তথ্যসূত্রঃ 16th International Congress on Infectious Diseases (ICID): Abstract 61.014. Presented  April 5, 2014.

Friday, 4 April 2014

গাঁজায় কেমন আসক্তি হয়?


গাঁজার নেশা সৃষ্টিকারী মূল উপাদানটির নাম টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল (THC)। গাঁজায় এর পরিমাণ যত বেশী হবে, সেটা তত শক্তিশালী। অনেকের মনে একটি প্রশ্ন ছিল যে শক্তিশালী গাঁজা সেবন করলে কি আসক্তি জন্মানোর সম্ভাবনা বেশী?
সম্প্রতি একটি গবেষণার ফলাফলে এ প্রশ্নের জবাব মিলেছে। ডাচ গবেষকগণ এখন বলছেন কড়া ডোজের গাঁজা সেবনের সময় গাঁজাখোররা এমনভাবে ধোঁয়া টানে যে আসলে তার ফলে শরীরে খুব বেশী টেট্রা হাইড্রোক্যানাবিনল প্রবেশ করে না। ফলে আসক্তি জন্মানোর বিষয়টি তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মানসিক স্বাস্থ্য এবং মাদকাসক্তি ইন্সটিটিইউটের একদল গবেষক এ পর্যবেক্ষণের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। প্রায় একশো গাঁজাখোরের ওপর টানা দেড় বছর পর্যবেক্ষণ শেষে তারা বলছেন কড়া ডোজের গাঁজা টানলেই যে বেশী আসক্তি জন্মাবে ব্যাপারটা তা নয়। কারণ গাঁজার ডোজ কড়া হলেও গাঁজাখোরেরা ধোঁয়া এমনভাবে টানে যে শরীরে তা মাত্রাতিরিক্ত হতে পারে না।
দেখা যায় প্রতি দশ জন গঞ্জিকা সেবনকারীর মধ্যে একজন এতে আসক্ত বা নির্ভরশীল হয়ে যায়। যারা নিয়মিত এবং অতিরিক্ত কড়া গাঁজা সেবন করে তাদের মধ্যেই আসক্তির সম্ভাবনা বেশী। আসক্তি জন্মানোর মূল উপাদান টেট্রা হাইড্রোক্যানাবিনল (THC) । 
ডাচ গবেষকগণ নেদারল্যান্ডের বিভিন্ন আস্তানা থেকে প্রথমে ৬০০ গাঁজাখোর খুঁজে বের করেন। তাদের মধ্য থেকে তারা ৯৮ জনকে তাদের পর্যবেক্ষণের জন্য নির্বাচন করেন । এদের গাঁজা সেবনের পুরো প্রক্রিয়াটি টানা দেড় বছর ধরে অনুসরণ করা হয়। তাদের গাঁজা সেবনের ধরণ, সময়কাল, কতটুকু ধোঁয়া টানছে, কতটুকু গাঁজা নিচ্ছে এবং তার মধ্যে কি পরিমাণ টেট্রা হাইড্রোক্যানাবিনল আছে- এসব বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে হিসেব রাখা হয়। তারপরে তারা ফলাফল হিসেব করে বলছেনঃ
·         গাঁজাখোরদের পুরিয়াতে টেট্রা হাইড্রোক্যানাবিনলের পরিমাণ ১ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত থাকে।
·         গাঁজার পুরিয়াতে টেট্রা হাইড্রোক্যানাবিনলের পরিমাণ যত বেশী থাকে, গাঁজাখোরেরা ধোঁয়া তত কম টানে। কারণ অল্প ধোঁয়াতেই তার নেশা জমে যায়।
·         ধোঁয়া টানার পরিমাণ আবার নির্ভর করে আসক্তি জন্মানোর ওপর। যারা গাঁজায় আসক্ত হয়ে পড়ে তারা ধোঁয়া বেশী টানে।
·         মাসে কতটুকু টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল গ্রহণ করে সেটার সঙ্গে দেড় বছর পড়ে নির্ভরশীলতা জন্মানোর সম্পর্কটি তেমন সরাসরি নয়।

যেকোনো মাদকাসক্তি জন্মানোর পেছনে অনেক রকম কারণ জড়িত থাকে। এখানে ব্যক্তির আর্থসামাজিক অবস্থা, তার মানসিক পরিস্থিতি এবং পরিবেশের প্রভাবের সঙ্গে বংশগতির মিথস্ক্রিয়া কাজ করে থাকে। অনেকে মনে করছেন ডাচ গবেষণা থেকে এখনই কোন সিদ্ধান্তে আসা সমীচীন নয়। তবে অতিরিক্ত গাঁজা শরীর এবং মন এ দুয়ের জন্যই ক্ষতিকর। এজন্য এসম্পর্কে আরও বিস্তারিত পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।

তথ্যসূত্রঃ van der Pol P, Liebregts N, Brunt T, et al. Cross-sectional and prospective relation of cannabis potency, dosing and smoking behaviour with cannabis dependence: an ecological study. Addiction. Published online March 16 2014